বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রধান কারণ হিসেবে কী বলা হয়? আমরা বলি, আইনের শাসন না থাকা ও দুর্নীতিবাজদের বিচার না হওয়া। অবশ্য এর বাইরে নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জবাবদিহির অভাবকে দুর্নীতির উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে দেখা হয়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সব সরকার বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও, এখন পর্যন্ত আমরা প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারিনি। এই না পারার পেছনে বহুবিধ কারণ কার্যকর থাকলেও যে বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সেটি হচ্ছে দুর্নীতি এবং বৈধ ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহার। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রে দুর্নীতির নির্লজ্জ উপস্থিতি। প্রবল উল্টোস্রোতে সমূলে ভেসে যাচ্ছে ন্যায়নীতি ও মূল্যবোধ। অনেকে বলেন পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনের প্রতিযোগিতা ভুলে গিয়ে, অধিকাংশ পেশাজীবী আজ দুর্নীতিবাজ হওয়ার মূষিক-দৌড়ে লিপ্ত। এই যখন বাস্তবতা, তখন সুযোগ পেলেই আমরা উন্মাদের মতো অর্থগ্রাসে জড়িত হই। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে, স্বার্থবাজ গোষ্ঠী যেন হামলে পড়ে নগদ অর্থের ওপর। ‘কীভাবে টাকা আয় করা যায়’, এই যখন অধিকাংশের ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠে, তখন অনেক কিছুর সুস্পষ্ট অনুপস্থিতিকেই প্রকট করে তোলে। এমন কালগহ্বর থেকে আমরা কীভাবে উদ্ধার পাব, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
অধিকাংশ মানুষের মধ্যে অদ্ভুত এক মনস্তস্ত¡ গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে, কোনো না কোনো ক্ষেত্রে যারা কর্তৃত্বের অধিকারী। শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে উদযাপন এবং ১০ হাজারের অধিক শেখ মুজিবের নামে ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যমে অর্থ অপচয় ও ক্ষতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব টাকা ‘নয়ছয়ের’ মূল রহস্য উদঘাটন করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর নেপথ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততা উদঘাটিত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতি উৎসাহী হয়ে রাষ্ট্রের টাকা লুটে নিয়েছেন। মুজিববর্ষের নামে কোন কোন মন্ত্রণালয় কত কোটি টাকা খরচ করেছে, তা নিয়ে ডকুমেন্টেশন হবে, সেগুলোর একটা লিস্ট করা হবে। এরপরই অনুষ্ঠানের যাবতীয় খরচের তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে সরকার। গত ২২ মে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে খরচের তথ্য চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে দুদক। কারণ শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণসহ নানা অনুষ্ঠান করে অর্থ হরিলুট করার তথ্য পেয়েছে দুদক। এছাড়া কোন কোন খাতে বেশি দুর্নীতি হয়, সেই তথ্যও উদঘাটন করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে বেবিচকে ৩৬টি খাত নিয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে বলে দুদক তথ্য পায়। ইতিমধ্যে দুদকে একটি তালিকা করা হয়েছে।
মুজিববর্ষ পালন উপলক্ষে আগে থেকেই আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করে। সারা দেশে ১ হাজার ২২০টি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য বানানো হয়। সরকারি ৭০০ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জেলা-উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ মিলিয়ে ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণ হয়েছে ১০ হাজারের বেশি। সব জেলা পরিষদে ম্যুরাল নির্মাণে খরচ হয় ৮ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত। সড়কের শুরুতে, শেষে, চৌরাস্তায়, নদীর তীরে, পুকুর পাড়ে, প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে এগুলো বসানো হয়নি। এর ফলে কী হয়েছে? এসব ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য আসলে কী ছিল? সমাজমানসে চেতনার বিস্মৃতি নাকি অর্থ গলাধঃকরণ? চৈতন্যের এমন অধঃপতন, আমাদের বিস্মিত করে। আমরা সত্যিকার অর্থেই কি বিশে^ দুর্নীতি, কপটতা, দুরাচার, হিংস্রতা এবং প্রতারণার উদাহরণ হতে চলেছি? সরকার যদি এ বিষয়ে সুকঠিন পদক্ষেপ না নিতে পারে, তাহলে বুঝে নিতে হবে এর শেকড় জড়িয়ে আছে অনেক গভীরে। আমরা শুধু শুনব, জানব, দেখব করার কিছুই নেই। এমন অর্থ আত্মসাৎ উন্মাদনা কবে থামবে কে জানে?