উইম্বলডনে রেকর্ডসংখ্যক শীর্ষ বাছাইয়ের বিদায় কেন?

উইম্বলডনের এবারের আসরে যেন একের পর এক ভূমিকম্প! মাত্র দ্বিতীয় রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছেন রেকর্ড ৩৬ জন বাছাই খেলোয়াড়—পুরুষ ও নারী মিলিয়ে, যা গ্র্যান্ড স্লামের ইতিহাসে নতুন এক নজির। এই সংখ্যাটি ছাড়িয়ে গেছে ২০২০ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনের আগের রেকর্ড (৩৫)। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—কেন এমনটা ঘটছে?

এই বছর উইম্বলডনের শুরুটাই হয়েছিল রেকর্ড গরম দিয়ে—৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল তাপমাত্রা। খেলোয়াড়দের দেওয়া হয়েছিল আইস প্যাক, ঠান্ডা তোয়ালে আর অঢেল পানি। তবুও অনেকে বলছেন, এই তাপমাত্রা তাদের জন্য ‘শকিং’। ব্রিটিশ টেনিস তারকা ক্যামেরন নরি তো খোলামেলাই বললেন, এমন আবহাওয়া গায়ে সইছিল না।

তাপমাত্রার প্রভাব শুধু খেলোয়াড়দের শরীরে নয়, প্রভাব পড়েছে কোর্টেও। কানাডার ২৭তম বাছাই ডেনিস শাপোভালভের মন্তব্য, “এই বলগুলো সবচেয়ে বাজে, ঘাসের কোর্ট যেন ঠাট্টায় পরিণত হয়েছে। এটা এখন ক্লে কোর্টের চেয়েও স্লো।”

উইম্বলডনের প্রধান গ্রাউন্ডসম্যান অবশ্য একমত নন। তাঁর মতে, ঘাস শুকিয়ে গিয়ে বল বেশি গ্রিপ করে বলেই স্লো লাগছে। কিন্তু খেলোয়াড়েরা বলছেন—বলগুলো ফুলে গিয়ে ভারী ও ধীরগতির হয়ে পড়ছে।

ইমা রাদুকানু ও তার কোচ বলছেন, স্লাজেঞ্জার বলগুলো কয়েকটি লম্বা র‍্যালির পরেই ভারী হয়ে যাচ্ছে, যা বড় হিটারদের বেশি সুবিধা দিচ্ছে। যদিও উইম্বলডন কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৯৯৫ সাল থেকে বলের স্পেসিফিকেশনে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

টেনিস ক্যালেন্ডারে ঘাস কোর্টের সময়টা খুবই সংক্ষিপ্ত—মাত্র ৫০ দিনের মতো। ফ্রেঞ্চ ওপেন শেষে সরাসরি ঘাসে নামতে হয় খেলোয়াড়দের। কেউ কেউ তো প্রস্তুতির জন্য মাত্র একটিই ঘাস কোর্ট টুর্নামেন্ট খেলতে পারেন। যেমন ফ্রেঞ্চ ওপেন জয়ী কোকো গফ, যিনি বার্লিনে প্রথম রাউন্ডেই হেরে যান।

গফ নিজেই বলেছেন, “চারটি গ্র্যান্ড স্লামের মধ্যে উইম্বলডনেই সবচেয়ে বেশি অঘটন হয়, কারণ প্রস্তুতির সময়টুকুই অতি কম।”

এই টেনিস ক্যালেন্ডার শুধু শরীর নয়, মানসিক দিক থেকেও ধাক্কা দেয় খেলোয়াড়দের। বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে চারে থাকা ব্রিটিশ জ্যাক ড্রেপার বা অস্ট্রেলিয়ার অ্যালেক্স ডি মিনর বলছেন, তারা একপ্রকার ‘বার্নআউট’ হয়ে গেছেন।

জার্মান তারকা আলেক্সান্ডার জভেরেভ তো বলেই ফেলেছেন—তিনি কোর্টে নিজেকে "একাকী আর খালি" অনুভব করছেন।

একজন শীর্ষ বাছাইয়ের বিদায় মানেই বাকিদের মনে আশঙ্কা তৈরি—আমি কি পরবর্তী? আবার অপরপক্ষে, অল্প পরিচিত খেলোয়াড়দের মনে জাগে সাহস—“আমারও সুযোগ আছে!”

ম্যাডিসন কিজ যেমন বলেছেন, “সবাইকে হারতে দেখে নিজের ম্যাচেও চাপ বেড়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমিও বুঝি পড়ে যাব!”

কখনো আগের চেয়ে এত প্রতিযোগিতামূলক ছিল না টেনিস। ৭২তম র‍্যাঙ্কড আর্থার রিন্ডারকনেচ যেমন হারিয়ে দিয়েছেন জভেরেভকে। ফ্রান্সেস টিয়াফো বলছেন, “টেনিস এখন খুবই কঠিন। আপনি প্রস্তুত না থাকলে হারবেনই।”

নারী বিভাগের ১৩তম বাছাই আমান্ডা আনিসিমোভা, যারা এখন সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারেন ৩০ নম্বর লিন্ডা নস্কোভা পর্যন্ত কাউকে মুখোমুখি না হয়েই।

পুরুষদের বিভাগে রাশিয়ার কারেন খাচানভ বা ব্রিটিশ ক্যামেরন নরি পাচ্ছেন সহজ প্রতিপক্ষ—যাঁরা সবাই আনসিডেড বা কোয়ালিফায়ার।

২০০২ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত পুরুষদের বাছাই নির্ধারণ হতো ঘাস কোর্টে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখে। এখন সেটা বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং ভিত্তিক, যেমনটা নারীদের ক্ষেত্রেও হয়।

এই বছরের অঘটনের পর অনেকেই বলছেন—শুধু র‍্যাঙ্কিং নয়, কোর্টের ধরণও বিবেচনায় রাখা উচিত।

এবারের উইম্বলডন যেন টেনিস বিশ্বের এক নতুন চিত্র। গরম, বল, ঘাস, মানসিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে বড় তারকারা বিদায় নিচ্ছেন, সুযোগ পাচ্ছেন নতুনরা। শেষ হাসি কে হাসবেন, সেটাই এখন দেখার।