বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট মোকাবিলায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে শক্তির উৎস পরিবর্তন। জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান বাস্তবতা, রূপান্তরের প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
বর্তমানে আমাদের পৃথিবী এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ ক্রমে প্রকট হচ্ছে, আর অন্যদিকে বিশ্ব জুড়ে চলছে কার্বন মুক্তির এক ম্যারাথন দৌড়। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি কীভাবে জ্বালানির ভূমিকা পাল্টে যাচ্ছে এবং কীভাবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও কার্বন নির্গমনের মধ্যকার চিরাচরিত সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে এমন কিছু ধারণা, যা একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ধীর করার প্রয়োজনীয়তা এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি প্রযুক্তিতে উদ্ভাবনের গতি বাড়ানোর ওপর জোর দেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তারা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম ((CBAM) চালু করছে, যা তাদের সীমানায় প্রবেশকারী পণ্যের কার্বন নির্গমনের মূল্য নির্ধারণ ও কর আরোপ করবে। এর বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের মতো শক্তি সমর্থক কণ্ঠস্বর জীবাশ্ম জ্বালানিকে ‘তরল সোনা’ হিসেবে উল্লেখ করছে। তাদের ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ সেøাগান অন্য দেশগুলোকেও তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে কার্বন নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতির ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎসাহিত করছে। আজ প্রতিটি দেশই শক্তি পরিবর্তনের একই মৌলিক রোডম্যাপ অনুসরণ করার চেষ্টা করছে : প্রথমে শক্তিদক্ষতা বৃদ্ধি, তারপর নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সবকিছুর বিদ্যুতায়ন, এরপর সবুজ হাইড্রোজেন বা এর ডেরিভেটিভের মাধ্যমে উচ্চ শক্তি চাহিদার পরোক্ষ বিদ্যুতায়ন এবং সবশেষে, গাছ লাগানো বা কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্বন অপসারণ।
বর্তমানে তেল, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাস এখনো বিশ্বব্যাপী মোট প্রাথমিক শক্তির প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। তবে আশার কথা হলো, ২০২৪ সালে জ্বালানিতে মোট ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারই পরিচ্ছন্ন শক্তি প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে প্রবাহিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, পরিবর্তনের গতিপথ কোন দিকে।
জ্বালানি রূপান্তরের বাস্তবতা
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শক্তির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। অথচ ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানিতে মোট ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের মধ্যে ২ ট্রিলিয়নই প্রবাহিত হয়েছে পরিচ্ছন্ন শক্তি খাতে। এই ব্যবধান একদিকে আশা জাগায়, আবার অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরে। জ্বালানি রূপান্তর একটি একক মুহূর্তে সম্পন্নযোগ্য পরিবর্তন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ, জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং নীতিনির্ধারণ একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে সংযুক্ত।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সৌর ও বায়ুশক্তি এখন অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী হয়েছে। তবে এদের প্রাকৃতিক পরিবর্তনশীলতা ও অপ্রতুল সরবরাহ-নির্ভরতা কারণে শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা ও গ্রিড স্থিতিশীলতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ছোট দূরত্বের যাত্রী পরিবহনে ইলেকট্রিক গাড়ি (ev) ইতিমধ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বের ট্রাক, শিপিং এবং বিমান চলাচলে এখনো জ্বালানির বিকল্প শক্তি ঘনত্ব অর্জন করা সম্ভব হয়নি। শিল্প খাতেও একই সমস্যা দেখা যায়, যেমন সিমেন্ট উৎপাদন যেখানে উচ্চতাপমাত্রা ও রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া একত্রে চলে। এ ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজ (CCS)-এর মতো প্রযুক্তিগুলো সম্ভাবনার দরজা খুলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ ও পরিকাঠামো উন্নয়নে যথেষ্ট বিনিয়োগ হয়নি। কার্বনমুক্ত হাইড্রোজেন উৎপাদনে ইউরোপ এবং আমেরিকাকে আগামী পাঁচ বছরে তাৎপর্যপূর্ণ হারে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এদিকে SAF (Sustainable Aviation Fuel)-এর মতো ক্ষেত্রেও FID (Final Investment Decision)) এখনো সঙ্কুচিত।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা
জলবায়ু কার্যক্রম, কার্বন নিরপেক্ষতা এবং জ্বালানি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গতি প্যারিস চুক্তির পর থেকে অভূতপূর্ব। বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৮২ শতাংশের জন্য দায়ী ১০৭৮টি দেশ নেট-জিরোতে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই নীতিগত সংকেত ৯০০০-এর বেশি কোম্পানি, ১০০০ শহর এবং ৬০০ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘শূন্যের দিকে দৌড়’ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে।
আজকের অনেক দেশের শিল্প নীতি যেমন : ইউরোপীয় সবুজ চুক্তি, মার্কিন মূল্যস্ফীতি হ্রাস আইন এবং ভারতের আত্মনির্ভর ভারত দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে শক্তিশালী বাজার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডার স্তম্ভ হিসেবে শক্তি রূপান্তর প্রযুক্তি তৈরি করাকে লক্ষ্য করে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলো তাদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পোর্টফোলিওতে শক্তি প্রকল্পগুলোও অন্তর্ভুক্ত করে।
অনেক হাইড্রোকার্বন-রপ্তানিকারী দেশ, যারা রাজস্বের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারাও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিকল্পগুলো অন্বেষণ করতে চাইছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হাইড্রোজেন উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। তাদের লক্ষ্য জ্বালানি স্বনির্ভর হওয়া এবং বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা পরিবর্তন বা কার্বন শুল্কের প্রভাব মোকাবিলা করা। তা সত্ত্বেও, ২০২৪ সাল পর্যন্ত, মধ্যপ্রাচ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে পরিচ্ছন্ন শক্তি ক্ষেত্রে মাত্র ২০ সেন্ট বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী, ২০৫০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য নির্গমনের পথে এগিয়ে যেতে হলে, তেল, কয়লা ও গ্যাসে বার্ষিক বিনিয়োগ অর্ধেকেরও বেশি কমাতে হবে।
পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং জলবায়ু সুরক্ষা ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনীতিতে স্থান পাচ্ছে। ভারত ও ইইউ এবং ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তি, শক্তি সঞ্চয় এবং গ্রিড আধুনিকীকরণের মাধ্যমে তাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। জ্বালানি সরবরাহের সহজলভ্যতা, খরচ, চরম আবহাওয়ার ঘটনা থেকে স্থিতিস্থাপকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সবই এর অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বব্যাপী ৬৮৫ মিলিয়ন মানুষের এখনো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎসের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সৌর মাইক্রো-গ্রিড, সিএনজি গ্যাস রান্নার ব্যবস্থা এবং বর্জ্য থেকে শক্তি ইউনিটের মাধ্যমে এটি দ্রুত ও সস্তা হবে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং এর ফলে গ্যাস বাজারের ওপর প্রভাব দেখিয়েছে যে, ধনী দেশগুলো কীভাবে শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিস্তারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রেও একই রকম সমস্যা দেখা দেয়। কয়েকটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ঘনত্ব বিশ্বব্যাপী শক্তি পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
ন্যায়সংগত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপান্তর নীতিগুলো শক্তি পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক। এই কৌশলগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিকর্মীদের সহায়তা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণ দেবে, পরবর্তী প্রজন্মের কর্মীদের পরিচ্ছন্ন শক্তি দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করবে এবং দুর্বল ভোক্তাদের রক্ষা করবে।
শক্তি পরিবর্তনের বর্তমান ‘মধ্যম’ পর্যায়টি সহজ নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি বিশ্ব বাণিজ্য, ভূ-রাজনীতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বিশাল কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি কখনো কখনো দেশগুলোকে নীতিগত সিদ্ধান্ত সংশোধন করতে বাধ্য করে, যেমন ২০২২ সালে জার্মানির কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত। সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত এই পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে না দেখে আজই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আর্থিক অসাম্য ও বিনিয়োগ
পরিচ্ছন্ন শক্তিতে বিনিয়োগ আজ জীবাশ্ম জ্বালানির দ্বিগুণ হলেও এর সিংহভাগ এখনো উন্নত দেশেই কেন্দ্রীভূত। উদীয়মান দেশ ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য অর্থায়ন ব্যয় দ্বিগুণ বা তার বেশি। এতে করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়। ঋণের উচ্চ খরচ, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক ঝুঁকির অতিরিক্ত মূল্যায়ন এই ব্যবধানকে আরও গভীর করে তুলছে।
বিশ্বব্যাপী ৬৮৫ মিলিয়ন মানুষ এখনো নির্ভরযোগ্য শক্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সৌর মাইক্রোগ্রিড, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন যথাযথ বৈশ্বিক সহায়তা এবং ন্যায্য বিনিয়োগ কাঠামো।
শক্তি রূপান্তর কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নও বটে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বহু দেশ ও জনগোষ্ঠীর জন্য এই পরিবর্তন মানে জীবিকা হারানো, যা পুনঃপ্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করার জন্য নীতিনির্ধারকদের উচিত জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি দক্ষতা গড়ে তোলা এবং গরিব ও শক্তি দরিদ্র জনগণের জন্য প্রণোদনা তৈরি করা।