বৌদ্ধ ধর্মের আর্য সত্যের শ্রেণি বিভাজনের দুঃখ আর্যসত্যে বলা হচ্ছে ‘জীবন মাত্রই দুঃখময়। এতে রোগ আছে। ব্যাধি, জরা, শোক, মৃত্যু আছে। কর্মফলের বন্ধন হেতু সবাইকে জন্ম-জন্মান্তরে তার নিদারুণ নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। বলতে গেলে দুঃখ জন্মে, দুঃখ শৈশবে, দুঃখ বার্ধ্যকে, দুঃখ মরণে। এমনকি দুঃখ প্রিয় বিয়োগ ও অপ্রিয় সংযোগে। এখানে প্রতিনিয়ত মানুষ দুঃখের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলছে। আর সুখ একটি স্বপ্নমাত্র। সুতরাং সংসার জীবনে আবদ্ধ হওয়াই দুঃখের মূল কারণ, যা দেহ ও মনের ক্ষণিকতা বিচার করলে বোঝা যায়।’ এমন কথা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে ‘সংসার জীবন’ নিয়ে যা বলা হয়েছে। তবে আমি ‘ব্যক্তি’ হলে উত্তর হবে এক রকম আর সমষ্টি হলে আরেক। কিন্তু একটি কথা সত্য যে, ব্যক্তির কষ্ট বা অপ্রাপ্তি জীবনে দুঃখের কারণ হতে পারে। তবে এটি যৌথ জীবনযাপনে আরও বাড়বে। তাকে ভিন্নভাবে সমাধানের নামই জীবন। পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে পালিয়ে, সমষ্টিগত কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব না।
প্রকৃত অর্থে, মানুষ আসলে কী চায়? জীবনের নিরাপত্তা, প্রাচুর্য নাকি খ্যাতি? বেশি ভাবতে হবে না, এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে। মূলত তা নির্ভর করে, সেই মানুষটি কোন ধরনের আর্থিক সংগতির পরিবার এবং সমাজে বেড়ে উঠছে? যে কারণে দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠেছে একেক রকম। কারণ হচ্ছে একটি পরিবারের আর্থিক সংগতি, রাষ্ট্রের নীতি ও আদর্শ, শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ এবং সামাজিক কাঠামো ও পরিবেশ ঠিক কোন পর্যায়ে? পারস্পরিক পার্থক্য নিয়ে আসে তখনই, যখন একটি দেশ সব কাঠামোকে শক্তিশালী করে তার জনগণকে শাসন করে। নেপথ্যে তারাই, যারা নিজস্ব শক্তিকে নিজের মতো গড়ে তোলার চেষ্টা করে। সেখানে দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা বা জনকল্যাণ তেমনটি থাকে না।
গত শতাব্দীর সত্তর দশকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে আশির দশকের শুরুতেই আমাদের দেশে একটি চিত্র প্রকটভাবে চোখে পড়ে। তখন রাজনীতিতে দুটি ধারা ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করে। একটি গণতান্ত্রিক শক্তির আবরণে সহিংস রাজনীতি এবং আরেকটি বামধারা যারা অস্ত্র, অর্থের চেয়ে আদর্শকে আঁকড়ে ধরে। যে কারণে দেখা যায়, সেই সময় বামধারার রাজনীতি আমাদের দেশে শক্তিশালী হতে থাকে। অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী বাম আদর্শের ছায়ায়, নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ভেঙে যায়, তখন দেখা যায় আমাদের দেশেও অন্যরকম বিভক্তি। একে একে বিভক্তি বাড়তে থাকে। ফলে বাম জোট দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে। মজার বিষয় হচ্ছে, যখন রাজনীতিতে অস্ত্র এবং অর্থের দাপট, তখন বামশক্তি আদর্শ নিয়ে লড়াই করার নামে নিজেদের মধ্যে বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। এটি সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র নাকি নিজেদের গোঁয়ার্তুমি তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
বর্তমানে রাজনীতির চেহারা পাল্টে গেছে। এখন অধিকাংশই কোনো সামষ্টিক কল্যাণের কথা চিন্তা করে রাজনীতি করেন না। ছাত্ররাজনীতিরও একই দশা। যে কারণে আমরা উল্লেখ করার মতো কোনো নেতৃত্ব পাই না। এই না পাওয়া, আমাদেরই দায়। কারণ আমরা কখনো আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করিনি। ফলে বুর্জোয়া বলি আর শোষক শ্রেণি বলি তারা বাধাহীনভাবেই নিজেদের পুষ্ট করতে পেরেছেন। এখন সেই শৃঙ্খল ভেঙে নতুন মানবকল্যাণের রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব। যে কারণে সর্বত্রই নিজস্ব প্রাপ্তি এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হওয়ার নামই রাজনীতি হয়ে উঠেছে। সেখানে দেশ এবং জনকল্যাণ কোনো বিচার্য বিষয় নয়।
আশাবাদী মানুষরা বলেন, সময়ের স্রোতকে থামানোর চেষ্টা করতে নেই। নির্দিষ্ট সময়ে তা আপনাতেই থেমে যায়। কিন্তু রাজনীতি এ রকম তত্ত্ব দিয়ে চলে না। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে। অনেকে বলেন সময়কে যদি আমি ধারণ না করে, বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলি, তাহলে অস্তিত্ব এক সময় হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে আদর্শ নিয়ে লড়াই করা, দলগুলোর দশা, সেই কথাকেই সত্য প্রমাণ করছে। তাহলে এই মুহূর্তে দেশপ্রেমিক, নীতিবান, সৎ এবং কর্তব্যপরায়ণ মানুষের কাজ কী? প্রত্যেকেই কি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন? না, তেমন কথা কেউ বলছে না। তবে সেই মানবাদর্শকে ধারণ করে যারা এগিয়ে যেতে চায়, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। শক্তিশালী করতে হবে। না হলে কোনোভাবেই জনকল্যাণমূলক আদর্শ নিয়ে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকা সম্ভব নয়। যাদের জন্য রাজনীতি, তাদের নিজস্ব চিন্তার মধ্যে টেনে আনতে হবে। এই পথে হাঁটার জন্যই, পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। আসল কথা হচ্ছে, রাজনীতির কেন্দ্রে সাধারণ মানুষকে থাকতে হবে। তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি আমরা মনে করি, দেশটা আমাদের তাহলে আর সমস্যা থাকে না। এই ‘আমরা’ যখন ‘আমি’ হয়ে যায়, তখনই শুরু গন্ডগোল এবং বিভক্তির। সেখানে কোনো আদর্শ নেই, কারণ হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতায় আর যাই হোক, জনকল্যাণের রাজনীতি হয় না।
আমরা দেশে শান্তি চাই। অনেক তো হলো। আর কত? ‘রাজনীতি’ যদি সত্যিকার অর্থেই ‘নীতির রাজা’ হয়, তাহলে নিজ দেশের জন্য সামান্য হলেও, অবদান রাখতে হবে। অর্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন, কিন্তু জীবন কি শুধু অর্থের জন্যই? নিজস্ব চিন্তাকে মানবকল্যাণ কিংবা সমষ্টির জন্য যদি নাই-ই বিলাতে পারলাম, তাহলে জানোয়ার এবং এই আমার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? মানুষ ষড়রিপুর মাধ্যমে তাড়িত হবে, এটা স্বাভাবিক। তবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করাই সভ্যতা। এই সভ্যতাকে আরও উন্নত করা ‘রাজনীতি’। তখন আর ‘আমি’ উপস্থিত থাকে না। সব হয়ে যায় ‘আমরা’। রাজনীতি প্রকৃত অর্থে যতদিন আমাদের দেশে, ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ না হচ্ছে, ততদিন গণমানুষের মুক্তি আসবে না। আর মানুষের মুক্তি আসে, কল্যাণমূলক রাজনীতিতে প্রতিহিংসায় নয়। যেখানে শুধু থাকে, সমষ্টিকে নিয়ে দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়া।
লেখক : সাংবাদিক
tapas.raihan@gmail.com