জুনে সড়কে নিহত ৭১১

আগের ১৫ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিগত সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তবুও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও সড়ক খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত জুন মাসে ৬৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭১১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯০২ জন আহত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা গত মে মাসের তুলনায় ৯৭ জন বেশি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আলোচ্য সময়ে রেলপথে ৫৪টি দুর্ঘটনায় ৫৬ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছে। নৌপথে ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয়েছে। সড়ক, রেল, এবং নৌপথে ৭৪৩টি দুর্ঘটনায় ৭৮০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯১৬ জন আহত হয়েছে। আলোচ্য সময়ের সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২২৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৪৪ জন নিহত এবং ২১২ জন আহত হয়েছে। এটি মোট দুর্ঘটনার ৩৩.৩৮ শতাংশ, নিহতের ৩৪.৩১ শতাংশ, এবং আহতের ১১.১৪ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে ১৬০টি দুর্ঘটনায় ১৭২ জন নিহত এবং ৫৮৮ জন আহত হয়েছে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং ৪৫ জন আহত হয়েছে। মোট দুর্ঘটনার ৪১.২৮ শতাংশ গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা, ২৯.৬৫ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২১.৩১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া, ৬.৭০ শতাংশ বিবিধ কারণে, ০.২৯ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচানো এবং ০.৭৪ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মাসে মোট দুর্ঘটনার ৩৯.৬৪ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩১.১৪ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২৩.৫৪ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪.০২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৮৯ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ০.৭৪ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশগুলো হচ্ছে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা আমদানি ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করা; জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতে অবাধে চলাচলের জন্য আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা; দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান; গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেনের ব্যবস্থা করা; সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা; মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা; সড়ক পরিবহন আইন উন্নত বিশ্বের আদলে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রয়োগ করা; সারা দেশে উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা; মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন ও দীর্ঘদিন ধরে ফিটনেসহীন যানবাহন স্ক্যাপ করার উদ্যোগ নেওয়া এবং ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী চালকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভ্যাট ও আয়কর অব্যাহতি দিতে হবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘নতুন সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সড়ক খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সরকার সড়ক নিয়ে মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করছে, কিন্তু সেখানে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না। এখন পর্যন্ত সরকারের সব সিদ্ধান্ত মালিকদের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের স্বার্থে কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কমার কোনো লক্ষণ নেই। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যরা ১১১টি সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা জোরদার এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই সুপারিশগুলো প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ এই সুপারিশগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যেত। সরকারের উচিত এই সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে।’