ব্রাজিলের ফোজ দো ইগুয়াসু শহর জলপ্রপাতের জন্য বিখ্যাত। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিস্ময়কর। কিন্তু এ শহর শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানেরও অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানেই অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ইসলামি স্থাপনা ওমর ইবনে খাত্তাব মসজিদ। এটি ব্রাজিলের মুসলমান সমাজের আত্মপরিচয়, স্থাপত্যিক ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক। ফোজ দো ইগুয়াসুতে ইসলাম প্রবেশ করে লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি মুসলমান অভিবাসীদের আগমনের মধ্য দিয়ে। বিংশ শতকের প্রথম ভাগে এ শহরটি ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এক বহুজাতিক অভিবাসী শহরে পরিণত হয়। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে নির্মিত হয় এ মসজিদ। প্রায় দেড় বছর সময় নিয়ে গড়ে ওঠা এ স্থাপনা উদ্বোধন হয় ১৯৮৩ সালের ২৩ মার্চ। এটা তৈরি হয় স্থানীয় মুসলমানদের অনুদানে। নাম রাখা হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর নামে, যিনি ন্যায়বিচার ও দূরদর্শী শাসনের জন্য স্মরণীয়।
স্থাপত্যশৈলী : সাদা রঙের গম্বুজ ও সুউচ্চ দুটি মিনারবিশিষ্ট মসজিদটি নির্মাণশৈলীতে অনুপ্রাণিত হয়েছে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ থেকে। এর কেন্দ্রীয় গম্বুজটির উচ্চতা প্রায় ১৮ মিটার ও ব্যাস ২১ মিটার, যা দক্ষিণ আমেরিকায় বিরল। মিনার দুটি ৩১ মিটার উঁচু, যা শহরের আকাশরেখায় সৌন্দর্যের শীর্ষবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মূল প্রার্থনাকক্ষটির আয়তন ৪০০ বর্গমিটার, পুরো ভবনের আয়তন প্রায় ৬০০ বর্গমিটার। গম্বুজ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে পিলারবিহীন ফ্রি-স্প্যান রিইনফোর্সড কংক্রিট প্রযুক্তি, যা স্থাপত্যে এক কৃতিত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ভেতরে রয়েছে নীল কার্পেট, জ্যামিতিক আরবস্ক নকশা ও দিকনির্দেশক মিহরাব, যা কেবলার দিকে ইঙ্গিত করে।
সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্র : নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ওমর ইবনে খাত্তাব মসজিদটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কেন্দ্রও। এখানে আরবি ভাষা শিক্ষা, কোরআন শিক্ষা, রমজান ও ঈদ উদযাপন, ইসলামি বিয়ের অনুষ্ঠান এবং সমাজকল্যাণমূলক নানা কার্যক্রম চলে। পাশাপাশি রয়েছে একটি গ্রন্থাগার ও প্রদর্শনীকক্ষ, যেখানে ইসলাম ও আরব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার, যারা এ মসজিদ ঘিরেই সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করেন। তবে এটি শুধু মুসলমান, অসংখ্য অমুসলিম পর্যটকও প্রতিদিন এখানে আসেন, জানেন ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্য।
দর্শনার্থী : বর্তমানে মসজিদ পরিদর্শনে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট ট্যুরিজম সাইকেল। প্রথমে দর্শনার্থীরা যান রিসেপশন সেন্টারে, যেখানে ইসলামের মৌলিক ধারণা, মসজিদের ইতিহাস এবং স্থানীয় মুসলিম সমাজ নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেওয়া হয়। এরপর সরবরাহ করা হয় বিনামূল্যের ইসলামি বই, কোরআনের অনুবাদ ও উপহারসামগ্রী।
নারী পর্যটকদের জন্য বাধ্যতামূলক পর্দার ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের জন্য স্কার্ফ ও স্কার্ট সরবরাহ করা হয়, পুরুষদের জন্য রয়েছে পূর্ণ প্যান্ট পরিধানের নির্দেশনা। এরপর পর্তুগিজ, ইংরেজি, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ গাইডরা মসজিদের স্থাপত্য ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেন। সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটি হয় শান্তিপূর্ণ, তথ্যনির্ভর ও আন্তরিক।
সহাবস্থানের প্রতীক : ফোজ দো ইগুয়াসু এক বহুজাতিক শহর, যেখানে সহাবস্থান করে খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়। এ সহাবস্থানের অনন্য নিদর্শন ওমর ইবন খাত্তাব মসজিদ, যেখানে মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় খ্রিস্টান স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও নিয়মিত পরিদর্শনে আসে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : মসজিদ কর্র্তৃপক্ষের পরিকল্পনা রয়েছে যুব উন্নয়ন প্রকল্প, ইন্টারফেইথ ডায়ালগ, বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্তি এবং সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি চালুর। এর মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।