জাতীয় নির্বাচন প্রস্তুতিতে স্বস্তির আভাস শেয়ারবাজারে

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছুদিন দেশের শেয়ারবাজার চাঙ্গাভাব থাকলেও পরে দীর্ঘমেয়াদি মন্দায় পড়ে। তবে গত সপ্তাহের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক ধারায় ছিল শেয়ারবাজার। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করার পরামর্শ দিয়েছে। যা বেসরকারি খাতসহ পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তির আভাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গত সপ্তাহে বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদায়ী সপ্তাহে শেয়ারবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজারের মূল্যসূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহের তুলনায় ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আলোচ্য সপ্তাহে গড় টার্নওভার ৩০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে সব খাত বৃদ্ধি পেয়েছে।

পুঁজিাবাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় আছে। অন্তর্বর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। সেজন্য নির্বাচনের প্রস্তুতির ঘোষণা স্বাভাবিকভাবে সাড়া জাগিয়েছে। তবে শুধু নির্বাচনের ঘোষণায় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেনি। বর্তমান কমিশনের নানামুখী উদ্যোগও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ জাগিয়েছে বলে মনে করেন তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১০ পরবর্তী-সময়ে দেশের শেয়ারবাজার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমান সরকার সেই বাজারকে মূল ধারায় ফেরাতে শুরু থেকে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম সামনে এসেছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে। তবে, সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে কোনো চক্র বাজারে সক্রিয় হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করতে চাচ্ছে কি না, সে বিষয়টিও নজরে রাখতে কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। যাতে কোনো পক্ষ বাজারকে ৯৬ বা ২০১০ পর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারে।

এ প্রসঙ্গে বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, একটি রুগ্ন বাজার ও বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থার সংকট সময়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি। আশা করছি, পুঁজিবাজার ভালে করবে। আর কোনো কারসাজিচক্র বাজারে মাথাচাড়া দিতে চাইলে প্রতিহত করার সব প্রস্তুতি কমিশনের রয়েছে। বাজার নিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা নিতে দেওয়া হবে না।

জানা গেছে, অনুকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ছে। বাজার অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট কিছু খাতে কৌশলগতভাবে বিনিয়োগ করছেন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য আসন্ন ঘোষণাগুলোও তাদের আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিজি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শেয়ারবাজার সহায়তা প্রদান ও তারল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই যে সব বিনিয়োগকারী বর্তমান বাজারে পর্যবেক্ষণ করছেন, তারা এখন বাজারে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হতে পারেন। সার্বিকভাবে বলা যায়, আগামী সপ্তাহে বাজার কিছুটা ইতিবাচক থাকার পাশাপাশি লেনদেনে সামান্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার মো. আলী আকবর বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশের শেয়ারবাজারের মাঠ পুরোপুরি প্রস্তুত। বর্তমান সময়ে যারা বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য ভালো ফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আপনারা কোন ধরনের মাঠ চান আমরা জানি না। আমরা চাই বিনিয়োগকারীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আর পুঁজিবাজারও যেন উন্নতি করে। আমরা চাই মার্কেট ভালো হোক।

তিনি বিনিয়োগকারীদের নিকট প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা কি ফাউল খেলতে পারবেন এমন মাঠে আস্থা পাচ্ছেন না? নাকি শৃঙ্খলভাবে খেলার মাঠে আস্থা পাচ্ছেন না? যেখানে প্লেয়িং ফিল্ডে সুন্দরভাবে খেলা যায়। আমি বুঝতে পারছি না বিনিয়োগকারীরা কোন ধরনের মার্কেটের জন্য আস্থার সংকট দেখছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের দিক থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতির ঘোষণা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি নজরে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে একটা ইতিবাচক সাড়া এসেছে। তবে এ কারণেই যে শেয়ারবাজার ভালো হচ্ছে, এটা ঠিক নয়। কারণ দীর্ঘ ৭, ৮ মাস ধরে বাজার নেতিবাচক ছিল। এখন ৫ বা ৬ দিন ভালো ইঙ্গিতের কারণে বাজার ঠিক হয়ে গেছে, এটা বলা যাবে না। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে বর্তমান অবস্থায় আসার জন্য বিএসইসিকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। কারণ বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। এটি আমাদের উৎসাহিত করছে। আর আমাদের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক।

বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমিশনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন থেকে বিনিয়োগকারীরা পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমান কমিশনের অনেক উদ্যোগ ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে আমরা মনে করি। বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে যেসব সংস্কার দরকার সেখানে কমিশন বেশ ভালো ভূমিকা নিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়ছে। আমরা বাজারকে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করার জন্য কাজ করছি। অনেকটা সক্ষম হয়েছি। চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান কমিশন সবার জন্য সমান, কাউকে সুযোগ করে দিতে কমিশন দায়িত্ব নেয়নি।

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা ও বিএনপি মহাসচিবের আহ্বান : গত বুধবার ৯ জুলাই আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে ডিসেম্বরের মধ্যে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক প্রস্তুতি শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন রকমের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের আলোচনা ও নির্দেশনার বিষয় জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

অপরদিকে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদের পাশাপাশি দ্রুত সব কাজ শেষ করে ‘নির্বাচনের পরিবেশ’ তৈরি করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের  মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।