একসময় ‘মানুষ হওয়া’র শিক্ষা শুরু হতো, গল্পের মাধ্যমে। জ্ঞানের ছোঁয়ায় থাকত প্রকৃতির শুদ্ধতা। এখন সেই সময় নেই। পাল্টেছে বিনোদনের ধরন। জীবনের প্রকৃতি পর্দায় বন্দি। আজকের শিশুরা মুখোমুখি নয় স্ক্রিনে বন্দি। কল্পনা নয়, কন্টেন্টে বিভোর। ভাবনার জগতে নয়, ভিউয়ের সংখ্যা হয়ে উঠেছে আত্মতৃপ্তির মানদণ্ড। মোবাইল নিয়ন্ত্রণ করছে মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কের জাল বিস্তৃত যান্ত্রিকতায়। এ যেন ডিজিটাল অভিশপ্ত সময়। এই প্রজন্মের অধিকাংশের অলিখিত পাঠ্যবই টিকটক। পনেরো সেকেন্ডের একেকটা মিথ্যে বাস্তবতা। হাসি, নাচ, রঙ, আলোর ঝলক সব যেন আত্মার গভীরতা ঢেকে রাখে। আর শিশুমন ভুলে যেতে বসে আত্মসম্মান কী, শিক্ষা কী, মেধা কী। প্রযুক্তি কখনোই শত্রু নয়। শত্রু হচ্ছে, ব্যবহারবিধি ও সঠিক চেতনার অভাব। সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার, আমরা কেমন প্রজন্ম তৈরি করছি? একজন সৃষ্টিশীল নাগরিক, নাকি কনটেন্ট-ভিত্তিক আত্মবিস্মৃত প্রজন্ম? জাতির ভবিষ্যৎ কেবল বিনোদনের ধোঁয়াশায় বুঁদ হয়ে থাকলে, পতন অনিবার্য।
টিকটক একটি বহুমাত্রিক প্ল্যাটফর্ম। যেখানে একজন ব্যবহারকারী তার সৃজনশীলতা তুলে ধরতে পারে মাত্র পনেরো বা ত্রিশ সেকেন্ডের ভিডিওতে। শুরুতে এটি একটি নিরীহ অ্যাপ মনে হলেও, বর্তমানে এর বিপজ্জনক দিকগুলো দৃশ্যমান। অল্পবয়সীরা এই প্ল্যাটফর্মে যেভাবে যুক্ত হচ্ছে, তা সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য অশনি সংকেত। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের শহরাঞ্চলের ৭১ শতাংশ কিশোর-কিশোরী দিনে গড়ে তিন ঘণ্টা টিকটক ব্যবহার করে। পিউ রিসার্চের ২০২৪ সালের জরিপে বলা হয়, আমেরিকার ১৩-১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ টিকটক ব্যবহার করে, যার মধ্যে ১৯ শতাংশ ‘প্রতিনিয়ত’ এই অ্যাপে সময় কাটায়। যাদের হাতে গড়ে উঠবে আগামী সমাজ সেই তরুণ প্রজন্ম আজ যন্ত্রের সুরে বাঁধা পড়ছে। তাদের কল্পনা, সৃজন ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। টিকটককে নিছক একটি অ্যাপ মনে করা ভুল। এটি একটি কালচার, একটি দর্শন, একটি চলমান আগ্নেয়গিরি, যার উত্তাপে পোড়ে সমাজের ভিত্তি। নৈতিকতার পরতে পরতে যখন চমকপ্রদতা ঢুকে পড়ে, তখন সভ্যতা কেঁপে ওঠে। তখন শিক্ষকের কণ্ঠ নিস্তব্ধ হয়। তখন পিতার পরামর্শ মূল্যহীন মনে হয়। তখন মায়ের চোখের জলও সস্তা হয়ে পড়ে। এই আসক্তি শিশু-কিশোরদের মনোজগতে দীর্ঘস্থয়ী প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউসিএসএফ পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ২ ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটানো শিশুদের মধ্যে বিষন্নতা, উদ্বেগ, আত্মমর্যাদাহীনতা এবং মুড সুইং-এর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অল্পবয়সীদের ডিজিটাল আসক্তি তাদের সামাজিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। তারা বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। টিকটক-এর ফোর-ইউ ফিড অ্যালগরিদম একদিকে যেমন ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী ভিডিও পরিবেশন করে অন্যদিকে শিশুদের মনে অহেতুক চাহিদা এবং আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তোলে। একটি স্প্যানিশ গবেষণায় এসেছে, প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি টিকটক ব্যবহারকারী কিশোরীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই নিজেদের শরীর ও চেহারা নিয়ে অসন্তষ্ট। এই প্ল্যাটফর্মে ‘চ্যালেঞ্জ কনটেন্ট’-এর ব্যাপকতা ভয়াবহ রকমের। কখনো আগুন খাওয়ার চ্যালেঞ্জ, কখনো উঁচু বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ, কখনো দমবন্ধ করে রাখার চ্যালেঞ্জ। এইসব ভিডিওতে যেসব কিশোর অংশ নিচ্ছে, তারা বুঝতেই পারছে না এতে কী পরিণতি হতে পারে। ‘ব্ল্যাকআউট চ্যালেঞ্জ’ নামের একটি চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে গিয়ে ইতিমধ্যে বহু কিশোর-কিশোরী প্রাণ হারিয়েছে। ইউনিসেফ এবং সেভ দ্য চিলড্রেন উভয়ই এসব ‘চ্যালেঞ্জ’ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের মধ্যে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ ভাষা এবং অঙ্গভঙ্গির ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গ্রামেগঞ্জের স্কুলপড়–য়া ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মে ভিডিও বানাচ্ছে। এসব ভিডিও ভাইরাল হওয়াকে তাদের অর্জন মনে করে। অথচ তারা বোঝে না, এই ‘ভিউ’ তাদের আত্মিক পরিপক্বতা কেড়ে নিচ্ছে। আরও ভয়ংকর হচ্ছে, টিকটক এখন অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
টিকটক কর্র্তৃপক্ষ কনটেন্ট মনিটরিংয়ের জন্য যে ব্যবস্থা রেখেছে, তা প্রান্তিক দেশগুলোয় কার্যত অকার্যকর। বাংলাদেশের মতো দেশে ভিডিওগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ হয় না বললেই চলে। যে কারণে অশালীন ভিডিও, বিভ্রান্তিকর বার্তা এবং মানসিকভাবে ক্ষতিকর ট্রেন্ড খুব সহজে ভাইরাল হয়। এখান থেকে শিশু-কিশোরদের সরানো না গেলে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম তাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেবে। আনন্দের নামে তারা হারাবে তাদের শৈশব, ভাবনার নামে তারা করবে ভুলের চর্চা। কোনো প্ল্যাটফর্মই একটি সুশিক্ষিত বিবেকবান সমাজের মতো শক্তিশালী নয়। এখন সেই সমাজ গড়ার সময়। নিঃশব্দে ধ্বনিত হওয়া যান্ত্রিক যুগের এই হাহাকার, সময়ের সবচেয়ে গভীর ট্র্যাজেডি। আমরা এখন নতুন একটি সভ্যতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এই সন্ধিক্ষণে আলো-অন্ধকার আছে। কোন পথে আমরা হাঁটব, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।
প্রজন্মের চেতনা, নৈতিকতা, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা একটি সমাজ গড়ে তোলে। এই মূল্যবোধগুলো তৈরি হয় পারিবারিক ঘরানা, পাঠ্যবইয়ের পাতা, গল্পের বইয়ের চরিত্রে, শিক্ষকের অনুপ্রেরণা এবং প্রকৃতির কোলে। অথচ আজকের শিশুরা এসব থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা বড় হচ্ছে, এক ধরনের ভার্চুয়াল অলীক বাস্তবতায়। এই সংস্কৃতি থামাতে হবে। একটি কনটেন্টের তাৎক্ষণিক খুশি যেন শিশুর চিরন্তন শৈশবকে গ্রাস না করে। আমাদের প্রয়োজন এক নতুন সকাল, যেখানে শিশুরা আবার খেলবে উঠোনজুড়ে, স্বপ্ন দেখবে গাছের ছায়ায় বসে আর শিখবে মানুষ হয়ে ওঠার পাঠ। এই রূপান্তরের শুরু হোক, শব্দের দীপ্ত আলোয়। জাতির ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তি ও সঠিক প্রযুক্তিবোধ সম্পন্ন মানবিক মানুষের হাতেই নিরাপদ। আমরা যেন নিজেকে হারিয়ে না ফেলি।
লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও সংগঠক
khandaker.apon@gmail.com