২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, কর্মস্থল থেকে খেতে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন কাঠমিস্ত্রি মো. ফারুক। এরপর সড়কে এক ঘণ্টার বেশি সহযোগিতা চাইলেও কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে উদ্ধারে। অবশেষে দুইজন ছাত্র ও এক সিএনজি চালকের সহায়তায় নানা জায়গায় বাঁধা পেরিয়ে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেলে পৌঁছান ততক্ষণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ফারুক।
এরপর কর্মস্থলের সহকর্মীরা স্ত্রী সীমা আক্তারকে জানানোর পর তিনি দুই সন্তানসহ এসে দেখতে পান স্বামীর নিথর দেহ। এরপর বহু রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের বিদায়ের পর নতুন করে দেশ গঠন হলো, মর্যাদা পেল সবাই শহীদ হিসেবে। কিন্তু আক্ষেপ কমেনি চট্টগ্রামের শহীদ ফারুকের স্ত্রীর।
গত বুধবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত কনসার্ট ও ড্রোন শোতে ১৬ জুলাই নিহত দুই শহীদের জায়গা হলেও হয়নি কাঠমিস্ত্রি ফারুকের।
এই নিয়ে দেশ রূপান্তরকে নিজের ও দুই সন্তানের আক্ষেপের কথা জানান শহীদ ফারুকের স্ত্রী সীমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি ছিলাম সে অনুষ্ঠানে। আমাকে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে, আমি দিয়েছি। কিন্তু যখন ড্রোন শো হলো— তখন ১৬ জুলাই নিহত দুই জনের ছবি প্রদর্শিত হলেও জায়গা হয়নি আমার স্বামী ফারুকের। আমার স্বামী কোনো দল করে না, সে ছাত্র না; সাধারণ একজন কাঠমিস্ত্রি বলে কি তার সঙ্গে এ অবিচার করা হলো?’
সীমা বলেন, ‘আজ এক বছর পার হচ্ছে কেউ আমাদের অবস্থা জানতে আসে না। আমি কি পরিমাণ কষ্ট করে আমার দুই সন্তান নিয়ে থাকি, তা আমি জানি। প্রথম দিকে একজন উপদেষ্টা এলেও এরপর কোনো ছাত্র প্রতিনিধি বা সরকারের কেউ আসে না। সঞ্চয়পত্র দেওয়া হবে বলে মার্চে কাগজপত্র নেওয়া হলেও সেটিরও কোনো খবর নেই।’
জুলাই শহীদের স্ত্রী বলেন, ‘১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে টাকা দুই ভাগ করে আমাকে পাঁচ লাখ আর ফারুকের বাবাকে ৫ লাখ দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ কবে পাবো তা-ও জানা নেই। আমার সাত বছরের মেয়ে ফারিহা দেখে সবার বাবা কাজ শেষে বাসায় আসে কিন্তু তার বাবা বাসায় আসে না। সে কান্না করে ঘুম ভেঙে উঠে বাবাকে খোঁজে। আমার ১৪ বছরের ছেলে ফাহিমুল ইসলাম আমাকে আক্ষেপ করে বলে— সবার বাবা তার সন্তানদের নিয়ে স্কুলে যায়, বেড়াতে যায়; কিন্তু আমার বাবা আর বাসায় ফিরে না।’
সীমা বলেন, ‘আমার দুই সন্তান খুব আশা করেছিলো— ড্রোন শোতে তাদের বাবাকে দেখানো হবে। কিন্তু তারা সেখানেও বঞ্চিত হয়েছে। আমার মেয়ে অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে আমাকে বলে দেখছো আম্মু আমাদের আব্বুকে ওরা কোনো ছবিতে কোনো শোতে জায়গা দেয়নি।
বুধবারের এই ড্রোন শো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও চলছে ব্যাপক-সমালোচনা। সেখানে সবাই একই প্রশ্ন রাখেন ১৬ জুলাই স্বৈরাচারী সরকারের দলীয় কর্মীদের গুলিতে নিহত হন তিনজন। সেখানে দুইজনের নাম সব জায়গায় প্রচারিত হলেও বারবার বাদ পরে যান কাঠমিস্ত্রি ফারুক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুজিবুর রহমান নামের একজন একটি পোস্টে কমেন্ট করেন, ‘এটাও দলীয় রাজনীতি। দলীয় ছাড়া অন্যান্য শহীদদের নাম দেয় নাই। এখন ভুলবশত শহীদ ওয়াসিমের নাম বাদ গেলে কেমন হত হয়তো এটা জানা আছে। সাধারণ জনতা বিনা কারণে প্রাণ দিছে তাই চোখে পড়তেছে না।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা রিজাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৬ তারিখে শহীদ হয়েছেন তিনজন, সেটা নিয়ে কারও আপত্তি থাকার প্রশ্ন নেই। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য থেকে গেছে। দুইজন শহীদ দুই দলের বলে তারা সব ধরনের সহযোগিতা পায়, সব জায়গায় আলোচিত থাকে। কিন্তু শহীদ ফারুক সাধারণ মানুষ কোনো দল করে না দেখে তার পরিবারের খোঁজ কেউ করে না, তাকে কেউ স্মরণ করে না। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ হওয়াটা বড় সমস্যা বড় অপরাধ। সেজন্য মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে দুই শহীদের জায়গা হলেও জায়গা হয়নি কাঠমিস্ত্রি ফারুকের।’
ড্রোন শো নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সমালোচনা করে রিজাউর বলেন, ‘এই শো করে উপদেষ্টা বুঝিয়ে দিলেন— এখানে দুই দলের লোক না হলে কারও জায়গা হবে না।’
এসব বিষয়ে জানতে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য জুবাইরুল আলম মানিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৫ জুলাই কনসার্ট ও ড্রোন শোয়ের জন্য সভার আয়োজন করা হলে সেখানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে আমরা চট্টগ্রামের ১১ জন শহীদদের ড্রোন শোতে জায়গা দেওয়ার অনুরোধ করি।
কিন্তু তিনি আমাদের বলেন, একটা সারপ্রাইজ থাকবে সবার জন্য। এরপরও আমরা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমকে অন্তত ৯ জন শহীদকে জায়গা দেওয়ার কথা বললে তিনি বলেন— মন্ত্রণালয় ব্যাপারটা দেখছে। কিন্তু গতকাল শো’তে দুজন বাদে আর কাউকে জায়গা দেওয়া হয়নি, যা আমাদের মর্মাহত এবং বিব্রত করেছে।
ফারুকের স্ত্রীর আক্ষেপের কথা জানানো হলে এ নেতা বলেন, আমরা নিয়মিত চেষ্টা করছি তারা যেন আর্থিক অনুদানগুলো সময় মত পেয়ে যান। আমরা আমাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে উনার ব্যাপারে কথা বলবো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে।
কনসার্ট ও ড্রোন শো আয়োজনের সমন্বয়কদের একজন সাঈদ খান সাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এই ড্রোনগুলো ১২ মিনিট পর্যন্ত উড়তে পারে। তাই আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা অনেক শহীদকে শো’তে জায়গা দিতে পারিনি। কিন্তু এখানে কাউকে অসম্মান করা হয়নি। আমরা সব শহীদদের নিয়ে ডকু ফিল্ম করবো, আলাদা আলাদা করে তাদের জীবনী নিয়ে স্মারক বের করবো। এই সরকার সময় পেলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমাদের এই কাজগুলো শেষ করতে পারবো আশা করি।