আজ বিশ্ব দরবারে মোড়ল হিসেবে আসীন হয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। খুবই কম সময়ের মধ্যে আমেরিকা আজ বিশ্ব মোড়ল। কারণ ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন ১৪৯২ সালে এবং ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হয়ে দেশটি স্বাধীন হয় এবং দেশটিতে ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত এক গৃহযুদ্ধ ছিল। প্রশ্ন হলো, দেশটি এত দ্রুত কীভাবে বিশ্ব মোড়ল হলো? ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচুর ধন-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এবং বিশ্বের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদন করে বিশ্বের খাদ্য ভান্ডারের এক বিশাল অংশের জোগান দিয়ে থাকে এই ভারতীয় উপমহাদেশ। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান দেওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা আজ বিশ্ব মোড়ল। কারণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় শক্তি বা উৎস হলো যুদ্ধাস্ত্র বিক্রয়। আমেরিকার স্বাধীন হওয়ার প্রায় ১৪০ বছর পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের কারণ ছিল জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সামরিক জোট, সামরিকীকরণ এবং সারায়েভো হত্যাকাণ্ড। প্রথমে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন এবং গোপনীয়তার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে তারা মিত্রপক্ষকে (ফ্রান্স ও ব্রিটেন) ঋণ ও অস্ত্র সরবরাহের সহায়তা করছিল। যা ত্রয়ী জোট বিশেষ করে জার্মানি বুঝতে পেরে মেক্সিকোকে এক গোপনীয় প্রস্তাব দেয়, যেখানে বলা হয় আমেরিকার কিছু অংশ মেক্সিকোর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কিন্তু আমেরিকা বুঝতে পেরে সরাসরি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন ১৯১৭ সালে। আমেরিকা বিপুল পরিমাণ সৈন্য, অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে মিত্রদের শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। অপরপক্ষে ত্রয়ী জোট আস্তে আস্তে শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে ১১ নভেম্বর ১৯১৮ সালে জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমেরিকা বিশ্ব দরবারে একটি বার্তা প্রদান করে যে, খুব শিগগিরই তারা বিশ্ব মোড়ল হবে। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৯২০ সালে লিগ অব নেশন গঠন করা হয়। যেখানে উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা এবং বিশ্বযুদ্ধে হানাহানি বন্ধ করা, সেই লক্ষ্যেই লিগ অব নেশন গঠনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন অগ্রণী ভূমিকা রাখে এবং তিনি লিগ অব নেশন গঠনে ১৪টি দফা প্রস্তাব দেন। যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দফা হলো, ‘একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সংস্থা সংগঠন’। এই নীতিগুলো লিগ অব নেশনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। লিগ অব নেশনের সদর দপ্তর ছিল জেনেভা, সুইজারল্যান্ড এবং লিগ অব নেশনের পরিসমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমেরিকা নিজে উদ্যোগ নিয়ে লিগ অব নেশন গঠন করল সেই লিগ অব নেশনের সদস্য ছিল না আমেরিকা নিজেই। ১৯৪১ সালে ব্রিটেন, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো মিত্র দেশগুলোকে অস্ত্র, খাদ্য, জ্বালানি ইত্যাদি সরবরাহ করে আমেরিকা। এই সহায়তা মিত্রশক্তিগুলোকে টিকে থাকতে ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এ কারণেই জাপান ক্ষিপ্ত হয়ে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি পার্ল হারবারে আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুহূর্তেই পাল্টে যায় যুদ্ধের চিত্র।
যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকা আরও দুটি কাজ করে। প্রথমটি হলো, ম্যান হার্টন প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরি করে। এই বোমা পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সালে যথাক্রমে ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ব্যবহার করা হয়। অথচ আজ তারাই বিশ্বের বড় বড় বয়ান রাখছে, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। দ্বিতীয়টি হলো, মার্শাল পরিকল্পনা। যার মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এতে ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ফলে আমেরিকা পূর্ণাঙ্গরূপে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ইউরোপের ওপর কর্র্তৃত্ব আরোপ করে শর্ত মানতে বাধ্য করে। ইউরোপসহ বিশ্ব আমেরিকাকে মোড়ল মানতে বাধ্য হয়। আমেরিকাও তার কূটনীতিতে সফল হয়। যে বীজ বপন করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, সেই বীজটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অঙ্কুরিত হয়। ধীরে ধীরে যা বড় হয়ে আজ ফলন দেওয়া শুরু করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় জাতিসংঘ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, যাতে ভবিষ্যতে বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো যায়। সেই থেকেই আমেরিকা তার কর্র্তৃত্ব ইউরোপের মাধ্যমে প্রতিফলিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, প্রতিটি যুদ্ধের পেছনে রয়েছে আমেরিকানদের অস্ত্র বাণিজ্য, যে অস্ত্র দিয়ে তারা আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে শাসন করছে। বিভিন্ন কারণে আমেরিকা জিডিপির যে বৃদ্ধি হয়, তার ধারে কাছে আরও পাঁচটি রাষ্ট্রের মোট প্রবৃদ্ধি যোগ করলেও আমেরিকার মোট জিডিপির সমান হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু উত্তর কোরিয়া ও ইরানে কেন কৌশলগতভাবে কীভাবে হেরে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?
কারণ হলো, কোরিয়া যুদ্ধে চীন যখন সরাসরি অংশগ্রহণ করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় (যে আশঙ্কায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে টুকরো করে ফেলে) এবং কৌশলগত কারণে খুব সুকৌশলে আমেরিকা ওই যুদ্ধ হতে পিছিয়ে যায়। অপরদিকে সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যুদ্ধেও আমেরিকা সরাসরি হেরে গেছে এটা বলা যায় না। আমেরিকার উদ্দেশ্য হলো, ইরান যেন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হয়। সেই দিক চিন্তা করলে আমেরিকার সফল। ইরানের সঙ্গে আপসের অন্যতম একটি কারণ হলো, বিশ্ব কূটনীতিকরা সরাসরি আমেরিকাকে দোষারোপ করছে এবং বিশ্ব কূটনীতিকের সমর্থন না পাওয়ার কারণে বিশেষত ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রই আমেরিকার ইসরাইলের সমর্থনের সমালোচনা করছে। বিশে^ এখন এটা প্রতিমান যে, আমেরিকার যুদ্ধনীতির কারণে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশীল রাষ্ট্র ইউক্রেনের ভগ্ন দশা, যা ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়েছে। যেভাবেই বিচার বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধের পেছনেই আমেরিকার সুচিন্তিত উদ্দেশ্য অস্ত্র বিক্রির এক বিশাল বাণিজ্য রয়েছে। যতদিন বিশ্বের যুদ্ধ আছে, ততদিন আমেরিকার মর্যাদা অক্ষুণœ থাকবে এই নীতিতেই আমেরিকা অগ্রসর হচ্ছে। আজ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ হলো, কাল অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য কোনো একটা রাষ্ট্রের যুদ্ধ থাকবে।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট
aktarrofikul@gmail.com