অভাব ঘুচানোর জন্য রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় জিএম বাড়িতে ভাড়া বাসায় থাকতো প্রতিবন্ধী সোহাগের মা বাবা। বাবা পেশায় রিকশাচালক, মা পোশাকশ্রমিক। এখানে তারা ছোট সন্তান প্রতিবন্ধী সোহাগকে সঙ্গে নিয়ে থাকতো।
গত বছরের ১৯ জুলাই বাড্ডায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ চলছিল। এরই মধ্যে সোহাগের বাবা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। মা অসুস্থতার যন্ত্রণায় বিছানায় কাতরাচ্ছেন। পাঞ্জাবি গায়ে বেরিয়ে পড়েছেন সোহাগ। জুমআ’র নামাজ পড়ে মায়ের সুস্থতার জন্য ওষুধ কিনে বাসায় ফিরবেন। সেখান থেকে আর ফেরা হয়নি।
মায়ের ওষুধ হাতে আন্দোলনে যোগ দেওয়া সোহাগ উত্তর বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন। সোহাগের মৃত্যুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্মৃতি ভুলতে পারেনি তার মা-বাবা। এখনো ছেলের কবরের পাশে বসে আহাজারি করে কান্না করেন মা সালমা বেগম। তার কান্নায় এখনো আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে।
সোহাগ রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের বড় পাহাড়পুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের ছেলে। দুই ভাইয়ের মধ্যে সোহাগ ছোট হলেও সংসারে সহযোগিতার জন্য ভাড়া বাসার পার্শ্ববর্তী ছোট একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। পাশাপাশি কবুতর পালন করে বিক্রি করতেন। এতে তাদের সংসারে সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছিল।
তবে গত বছরের জুলাইয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে অসহায় পরিবারের সব স্বপ্ন যেন থমকে গেছে। মায়ের বুকের একপাশ খালি হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তে ছেলের কথা মনে হয় মায়ের। কে জানত, মায়ের ওষুধ হাতে আন্দোলনে যাওয়া সেই ছেলেটি আর কোনোদিন ঘরে ফিরবে না।
সরেজমিনে সোহাগের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, আজ শনিবার (১৯ জুলাই) ছেলে হারানোর এক বছর হলেও শোকে কাতর হয়ে আছেন তার বাবা রেজাউল ইসলাম। কর্মহীন হয়ে নিঃশব্দে দিন কাটছে বড় ভাই সোহেল। সোহাগের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া ও হাজার লোককে খাওয়ানোর হইহুল্লোর আয়োজন থাকলেও সোহাগের মা যেন শোকের অতলে ডুবে গেছেন। ছেলের স্মৃতিতে কবরের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন তিনি। প্রতিদিন একবার ছেলের কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকেন। সেখানেই যেন খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া বুকের মানিক সোহাগকে। শহীদ সোহাগের মা সালমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘সকালে রান্না করে এদিক-ওদিক ছটফট ঘুরে বেড়াই। এটে যাই ওটে যাই, শুয়ে থাকি বসে থাকি কোনোটাতে হামার মন ভরে না বাবা। এতকিছু দিয়েও হামার মন ভরে না। কি করমো হামি এগুলো দিয়ে? হামি ষোল দিনের সন্তান নিয়ে ঢাকাত গেছিনু। অনেক দুঃখ কষ্ট করে ছ্যোলোক লালন পালন করেছি। গ্রামের মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিছিনো। এরপর হামার অসুখ হলে আবার ঢাকাত নিয়ে গেছি। ওর আব্বা অসুস্থ হছিলো। তখন কামাই ওজগার করে হামাক খাওয়াছিল। হামরা দুইজন অসুস্থ্য থাকার সময় ওই যা ওজগার করে আনছিল তাই খাছিনু। সেই সন্তান হামার পৃথিবীর বুকে নাই। হামাক যদি টেকা দিয়ে পুতিও থ্যোয় তাও হামার মন ভরবে না।’
ছোট ছেলে সোহাগের কথা মনে করে মা আরও বলেন, ‘খাতি, নিতি, উঠতি, বসতি সোহাগের কথা হামার সবসময় মনে হয়। সোহাগের যে দিন মৃত্যু হচি সেই দিন থ্যাকি হামার পাজরা হেনে উঠি গ্যেছি। ওই এতো বড়ো হলেও হামার ঘড়ে আছিলো। হামি অন্য মানুষের বাড়িত যাবার দেই নাই। ছ্যোল হামার জুমআর নামাজ পড়ি আসি আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খাবার চাছিলো। তা খাওয়াবার পারি নাই। হামিও আর খাই না।’
বিচারহীনতায় বছর পেরিয়ে যাওয়ায় সোহাগের মা মনে কষ্ট নিয়ে বলেন, ‘হামার ছ্যোলোক যে ব্যাডায় মারলো তাই তো ঘুড়ি বেড়াওছে। তার কি বিচার করলো সরকারে? কি বিচার করলো আইনে? আজ একটা বছর হয়্যা গেল আমি সন্তানের জন্য ঘুড়ি বেড়াই, কোন বিচার করলো হামার সন্তানের জন্যি? কোন কিচ্ছু দেখলাম না ? আজও আশেপাশের আ.লীগ আমার কতো অন্যায় অত্যাচার করতিচে আমি তা বুঝতিছি। হামরা এ জায়গায় কিভাবে যে আছি তা আল্লাহ মাবুদ ছাড় কেউ জানে না।’
শহীদ সোহাগের বাবা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আমার যে ছ্যোল এ্যানা কামাই ওজগার করে সংসার চালাতো সে তো মারা গেছে। তারপর থেকে আমিও কোন কাজ বাজ করতে পারি না। আগে ঢাকায় রিকশা চালাতাম। এখন আর কিছু করতে পারি না। সবাই হামার ছ্যোলের জন্যি দোয়া করেন।’
শহীদ সোহাগের ভাই সোহেল বলেন, সোহাগ মারা যাওয়ার পর থেকে কোন কিছু ভালো লাগে না। মা-আব্বা কান্নাকাটি করে। আজকে ওর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী। দেখেন মা এখনো কান্না করছেন কবরের পাশে বসে। মা বাবা কান্না করলে আমিও ঠিক থাকতে পারি না।