যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগে কখনো সে ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েনি বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কখনো এ ধরনের বেকায়দায় পড়েনি। এ ধরনের পাল্টা শুল্কের ইতিহাস নেই।’
এই অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ ই-মেইলের মাধ্যমে সোমবার (২১ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র বরাবর অবস্থানপত্র পাঠাবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। আর শুল্ক নিয়ে দর কষাকষির লক্ষ্যে তৃতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও এখনও সময়সূচি পায়নি বাংলাদেশ।
মার্কিন শুল্কের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে রবিবার বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ও প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ-বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ছাড়াও ১১টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এর মধ্যে অর্থ, বাণিজ্য, খাদ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্য, আইসিটি, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারও বৈঠকে অংশ নেন।
বাণিজ্য মন্ত্রনালয় সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমাতে বাংলাদেশ কি কি পদক্ষেপ নেবে তা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানপত্র চূড়ান্ত হচ্ছে। তবে তৃতীয় দফায় সম্ভাব্য আলোচনার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো জানায়নি মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর (ইউএসটিআর)। এ নিয়ে তৃতীয় ও চূড়ান্ত দফা আলোচনার সময়সূচি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ই-মেইলের জবাব পেতে আরও অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সচিব মাহবুবুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের পর থেকেই উন্নত দেশগুলোর ইতিহাস ছিল গরিব দেশগুলোকে ছাড় দেওয়া; কীভাবে তাদের বাড়তি করের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া যায়। তারপরও দেখা গেল অনেকে এটা করে না। তখন কোটা দেওয়া হলো। পরে দেখা গেল কোটায় সমস্যা হচ্ছে। এরপর কোটা তুলে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ডিউটি ফ্রি, কোটা ফ্রি মার্কেট অ্যাক্সেস দিয়ে দিল, ভ্যালু অ্যাডিশন কমিয়ে দিল।
তিনি বলেন, উন্নত দেশ তো এ ধরনের কাজ করেছে। তারা তো কখনো উচ্চ শুল্ক বসানো নিয়ে কিছু করেনি। ফলে এই অবস্থা যে বিশেষ একটা অবস্থা এটা বুঝতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মূল অবস্থানপত্র দিয়ে দিয়েছি। এখন যেটা দেওয়া সেটা কান্ট্রি স্পেসিফিক অবস্থানপত্র। যেমন আমার দেশের জন্য যেটা সেটা তো চীন, জাপান, ভিয়েতনাম কারও জন্য না।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে বাংলাদেশের। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের এদেশে প্রবেশাধিকার সহজ করা ও শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অ-বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক সংক্রান্ত একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের বিষয়ে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের সঙ্গে তৃতীয় দফার আলোচনা শুরুর আগে দেশের ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন মন্ত্রণায়ের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসারত মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর শুল্কের হার কমানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরেক দফা আলোচনা করবে বাংলাদেশ। সবার মতামত নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে তৃতীয় দফায় বৈঠকে বসার প্রস্তুতি চলছে।
প্রস্তুতি হিসেবে গত বুধবার একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আজ আবারও বৈঠক হবে আরও কিছু নতুন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। যেখান থেকেই বাংলাদেশের কাছে চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা ও তাদের দেওয়া শর্ত কতটুকু মানা সম্ভব, তা নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রে সফরে যাওয়া বাণিজ্য প্রতিনিধিরা। এরপর বেশি স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যদের পরামর্শ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এর আগে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল গত ৯-১১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে ইউএসটিআরের সঙ্গে সভা করে। কিন্তু সেখানে ৩৫ শতাংশ থেকে কমানোর কোন ঘোষণা আসেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্কিন শুল্কের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কিছু করার নেই। যা কিছু করার দুই দেশের সরকারকে করতে হবে। সরকার বিষয়টি ব্যবসায়ীদের অনেক দেরিতে অবহিত করেছে। আলোচনা রয়েছে, ব্যবসায়ীদের চুক্তির আংশিক জানানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কিছু করার আছে বলে মনে করি না।’
তিনি বলেন, ‘৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ১ আগস্ট পর্যন্ত সময় দিয়েছে, আজ (২০ জুলাই) পার হয়ে গেছে। হাতে আছে ১০ দিন। এ সময়ের মধ্যে তাদেরকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। এখন পর্যন্ত ভারত, ভিয়েতনাম, চায়না বা অন্য দেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে বলে আমরা জানি না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তির লক্ষ্যবস্তু অর্জন করতে পারবে বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি সার্বিক বিষয় চিন্তাকরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পাসহ অগ্রসর হওয়া দরকার।’