প্রাজ্ঞ সরকার ও নাগরিক প্রার্থনা

গণতন্ত্র শুধু নয় আধুনিক, সভ্য রাষ্ট্র ও দুনিয়ায় আজ জরুরি অনুষঙ্গ হচ্ছে ‘নির্বাচন’। আর নির্বাচন অর্থ রাষ্ট্রের ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে নির্ধারিত ব্যালট পেপারে ভোটদান এবং প্রার্থীর প্রাপ্ত সব ভোট একসঙ্গে যোগ করে ঘোষণার মাধ্যমে ফল ঘোষণা। এ কাজটি সঠিক, বিশ্বাসযোগ্য, নির্ধারিত আইন দ্বারা উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হলেই, তা যথাযথ ‘নির্বাচন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আমাদের এ রাষ্ট্রের বয়স পঞ্চাশ বছরের বেশি পার হয়ে গেলেও, এখনো এই ‘নির্বাচন’ শব্দটির সঙ্গে নাগরিকদের সুখকর এবং যথার্থ পরিচিতি গড়ে ওঠেনি। শুরুর সময় থেকে একটি সুষ্ঠু, সবার অংশগ্রহণ ধন্য, নিরঙ্কুশ বিশ্বাস লালিত নির্বাচন আমাদের এ রাষ্ট্রে আজও সম্পন্ন হয়নি। কথাগুলো আমরা যখন বলছি, তখনই দেশ রূপান্তরে রবিবারের প্রথম পৃষ্ঠায় নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে পুলিশের প্রস্তুতি ঘাটতির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন আমাদের শুধু নয়, পাঠককুল অর্থাৎ নাগরিকদের দৃষ্টির সামনে এসেছে। এ প্রতিবেদনে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠানে এর আগে ঘোষিত সরকারি ভাষ্যের উল্লেখ থাকলেও বলা হয়েছে নির্বাচনের মাস-তারিখ এখনো অনির্দিষ্ট।

দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত পুরো প্রতিবেদনের অন্তরালে অনেক সত্য উপলব্ধি করা যায়। নির্বাচনকে সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও নিয়ামানুগ করার জন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার প্রধান নিয়ামক পুলিশ বাহিনী সার্বিক প্রস্তুতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এ বাহিনীর এখন যা কিছুর অভাব লোকবল থেকে যানবাহন, অস্ত্রশস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি, এর জন্য বিগত অনির্বাচিত জবরদখলকারী সরকারই প্রধানত দায়ী। প্রতিটি সরকারকেই মনে রাখতে হয়, তার চলে যাওয়ার পরেও যেন রাষ্ট্রের সব কার্যক্রম নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে নিষ্পন্ন হতে পারে। এই আপ্তবাক্য যখন আমরা লিখছি, তখন এমন বাস্তবতাও উল্লেখ করা দরকার যে, এ রাষ্ট্রে ক্ষমতাচ্যুত বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকার শুধু নয়, কোনো সরকারই রাষ্ট্রের নাগরিকদের এ উপলব্ধি দিতে পারেনি। প্রতিটি সরকারের যেকোনো ধরনের প্রস্থান কিংবা অবসান শেষে নাগরিকদের শুনতে হয়েছে নেই, নেই, নেই। শুনতে হয়েছে, ‘ওরা’ সব শেষ করে গেছে। এজন্যই আমরা পুলিশ বাহিনীর প্রস্তুতি ঘাটতি উল্লেখে বলছি, রাষ্ট্রকে সুস্থ-সভ্য নিয়মতান্ত্রিক মেয়াদি সরকারভিত্তিক, মেয়াদ শেষে যথাযথ নির্বাচনকেন্দ্রিক, জবাবদিহিমূলক সাংবিধানিক ব্যবস্থায় চলতে ও চালাতে হবে। তবেই বর্তমান হবে নাগরিকদের দৃষ্টিতে মুখ্য এবং ভবিষ্যৎ হবে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিসারী। তাই প্রাজ্ঞ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নাগরিকদের এই হচ্ছে প্রধানতম প্রার্থনা যে, আমাদের অর্ধশতাব্দী প্রবীণ রাষ্ট্র কালবিলম্ব না করে, সভ্য দুনিয়ায় অনুসৃত রীতি এবং ধারায় চলবার সক্ষমতা অর্জনে পরিচালিত হবে।

আমাদের দিক থেকে এ ধারণা ব্যক্ত করতে চাইব যে, নির্বাচনকে প্রশ্নাতীত শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য যা কিছু দরকার; তার আয়োজনে অংশীজনের মতামত নেওয়া হোক। কিন্তু সবচেয়ে আগে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নির্বাচনমুখী চেতনা ও ধারায় পরিচালনার জন্য দরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চিত নির্দিষ্টতা। এজন্য সরকার বা কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ বা মাস ঘোষণা করা দরকার। এতে রাষ্ট্রের সব নির্বাহী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনমুখী কর্তব্য সম্পন্ন করায় তৎপর হবে, অংশীজনরা নিজেদের যথাবিহিত প্রস্তুত করতে পারবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ দায়িত্ব যথার্থ অনুধাবনে সুযোগ পাবে।