শিক্ষিকার ইচ্ছা অনুযায়ি বোনের গ্রামেই দাফন মাসুকার

একটি চেয়ারে নির্বাক বসা ৭০ বছর বয়সি বৃদ্ধ। তিনি সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরী। অনেক কথার পর এ প্রতিবেদককে এটুকুই বললেন, ‘মেয়েটার (মাসুকার) সঙ্গে একসপ্তাহ আগেও মোবাইল ফোনে কথা হলো। আমার জন্য টাকা পাঠাইছে বললো।’

মাসুকার মা সমিরন বেগম মারা গেছেন প্রায় ১৫ বছর আগে। পরিবারের একমাত্র ভাই থাকেন প্রবাসে। বাবা অসুস্থ। একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তবে নিজে বিয়ে কররেননি। শিক্ষক মাসুকার সংসার বলতে ছিলো শিক্ষার্থীরাই। জীবনের শেষ মুহুর্তেও শিক্ষার্থীদের জন্য লড়ে গেছেন মাসুকা।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর গ্রামের ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। সোহাগপুরে বড় বোন পাপিয়ার বাড়ি। মৃত্যুর আগে মাসুকা জানিয়েছিলেন লাশটা যেন তার বোনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। বোনের ইচ্ছা অনুযায়ি লাশ দাফনের কথাও তিনি বলে যান। সেই ইচ্ছা অনুযায়ি বোনের কথামতো সোহাগপুরে তার লাশ দাফন করা হয়।

মাসুকাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার চিলোকুট গ্রামে। তবে বেড়ে উঠেছেন পৌর এলাকার মেড্ডা সবুজবাগ থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি অনার্স করা মাসুকা চাকরি সুবাদে চলে যান ঢাকা। প্রথমে মিরপুরের একটি স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করেন। এরপর যোগ দেন মাইলস্টোন স্কুলে। তবে স্কুলটিতে তিনি ঠিক কত বছর ধরে আছেন সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সোমবারের বিমান দুর্ঘটনায় মাসুকা বেগম (৪০) আহত হন। রাতে তার মৃত্যুর খবর আসে।

মাসুকার ভাগ্নি ফাহমিদা নিধি এসব বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দিনভর খালাম্মার খোঁজ পাইনি। রাতে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে যখন খবর পাই এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর খবর আসে। তবে নানাসহ অন্যান্যদেরকে অনেক পরে খালাম্মার মৃত্যুর খবর শুনানো হয়।’

বড় বোন পাপিয়া আক্তারের স্বামী মো. খলিলুর রহমান বলেন, মাসুকারা তিন ভাই-বোন। ভাই প্রবাসে থাকে। মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনার পর আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে খবর নিতে থাকি। রাতে খবর পাই মাসুকা চিকিৎসাধীন আছে। তবে অবস্থা বেশি ভালো না। এরই মধ্যে গভীর রাতে তার মৃত্যুর খবর আসে। মাসুকার ইচ্ছা অনুযায়ি সোহাগপুর গ্রামে তাকে দাফন করা হয়।

ভৈরব সরকরী জিল্লুর রহমান কলেজের প্রিন্সিপাল আবু হানিফা বলেন, সে আমার প্রিয় ছাত্রী তার মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমন অল্প বয়সে আমার ছাত্রীর জানাজা পড়তে হবে এটা ভাবিনি। এমন যুদ্ধ বিমান অন্য কোথাও কি উড়ানো যেতো না? এমন প্রশ্ন রাখেন এই শিক্ষক।