ঢাকার আকাশে প্রশিক্ষণ বিমান কতটা যৌক্তিক?

রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ঘটে যাওয়া একটি প্রশিক্ষণ বিমানের দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে কাঁদিয়েছে। এ ঘটনায় আবারও সামনে এনেছে ঢাকাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা। ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে কেন জনবহুল শহর রাজধানী ঢাকার ওপর দিয়েই বিমান প্রশিক্ষণ? কেন জনমানবহীন নির্জন এলাকায় নয়? নাগরিক সমাজের প্রশ্ন যেখানে বঙ্গোপসাগরের বিশাল আকাশসীমা রয়েছে, সেখানে প্রশিক্ষণের জন্য রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহর কেন বেছে নেওয়া হলো? ঢাকার মতো জনবহুল এলাকার ওপর দিয়ে প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়ন কতটা নিরাপদ এবং যৌক্তিক? বিশে^র বহু দেশে প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলো সাধারণ মানুষের বসবাসের এলাকা থেকে দূরে রাখার রীতি থাকলেও, বাংলাদেশে উল্টো পথে হাঁটার কারণ কী? এই দুর্ঘটনা রাজধানীকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। উন্নত বিশে^র দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি কিংবা জাপান এদের বিমানবাহিনী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য সাধারণত জনমানবহীন বা জনবসতি-বিচ্ছিন্ন এলাকা নির্বাচন করে থাকে। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নেভাদা মরুভূমি, অ্যারিজোনার খোলা প্রান্তরে প্রশিক্ষণ দেয়। যেখানে রয়েছে নেলিস বিমানবাহিনী প্রশিক্ষণ এলাকার মতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া তার উমেরা অস্ত্র ও মহড়া পরীক্ষণ এলাকায় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, যা বিশে^র বৃহত্তম প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রগুলোর একটি। যুক্তরাজ্য তাদের স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস বা ওয়েলসের কিছু পাহাড়ি অঞ্চলে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। যেখানে জনবসতি তুলনামূলকভাবে কম। এসব প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য জনমানবহীন বা কম জনবসতি। বৃহৎ খোলা আকাশ ও ভূমি অঞ্চল। দূরত্ব রাডার, টার্গেট ট্র্যাকিং, ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের জন্য উপযোগী। প্রশিক্ষণের সময় বিকল্প ইমার্জেন্সি পাথ রয়েছে। তা ছাড়া কোনো প্রশিক্ষণ বিমান আকাশে উড্ডয়ন করলে তার পূর্বে স্থানীয় জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণের জন্য যেসব বিষয় বিবেচনা নেওয়া উচিত তা হচ্ছে নিরাপদ এলাকা নির্ধারণ করা। বিকল্প ল্যান্ডিং জোন বা যেকোনো ইঞ্জিন ব্যর্থতায় নিরাপদভাবে অবতরণের সুযোগ। জনসংখ্যা ঘনত্ব বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশিক্ষণ নিষিদ্ধ করা। আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতি বিবেচনা : খোলা জায়গা ও অনুকূল আবহাওয়া প্রশিক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসবের কোনো কিছুই ঢাকার নেই। আর জনবহুল এলাকায় বিমান প্রশিক্ষণ জননিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে। যার কঠিন দৃষ্টান্ত মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি। জনবহুল এলাকায় বিমান প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। সাউন্ড পলিউশন বা উচ্চ শব্দ জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। অপারেশনাল জটিলতা দেখা দেয়। জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কারণে প্রশিক্ষণ সীমানা সংকুচিত হয়। অসাবধানতাবশত বেসামরিক স্থানে বিমান ভেঙে পড়লে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতি জনআস্থা নষ্ট হয়, যা এই ঘটনার পর হয়তো সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বুঝতে পেরেছে। ঢাকার উত্তরা একটি উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা যেখানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন, বিপণিবিতান রয়েছে। এই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্কুলের ওপর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বহু শিশুর প্রাণহানির ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয় এটি সামরিক উড্ডয়ন নীতির বড় ধরনের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়। একটি প্রশিক্ষণ বিমানের ইঞ্জিন ফেল বা নিয়ন্ত্রণ হারানো যে ক্ষতির সৃষ্টি করতে পারে, তা এ দুর্ঘটনায় স্পষ্ট। এই এলাকার ওপর দিয়ে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়ন প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য কিছু করিডর বরাদ্দ থাকলেও, নিয়মিত ও ঘন ঘন রাজধানী অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন মানসিক চাপ তৈরি করে জনগণের মাঝে। বিশেষ করে হেলিকপ্টার বা টার্বোপ্রপ বিমানের হঠাৎ হঠাৎ ঘনবসতিতে নিচু দিয়ে ওড়া আতঙ্কের জন্ম দেয়। এ অবস্থায় সরকারের উচিত প্রশিক্ষণ বিমানের জন্য নতুন প্রশিক্ষণ জোন নির্ধারণ। যা দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল বা উত্তরাঞ্চলের খোলা এলাকাকে বেচে নেওয়া যেতে পারে। উড্ডয়ন করিডর পুনর্বিন্যাস বা জনবহুল এলাকাগুলো বাদ দিয়ে নিরাপদ করিডর পরিকল্পনা। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলাকালীন আশপাশের জনগণকে অবহিতকরণ। স্বচ্ছ তদন্ত বা দুর্ঘটনার তদন্তের ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রস্তুতি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পূর্বশর্ত। কিন্তু এই প্রস্তুতি যদি জনজীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে তা কার্যকারিতার বদলে বিতর্কের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে রাজধানীর আকাশে প্রশিক্ষণ বিমান চালানো কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্ন এখন সচেতন নাগরিকের মুখে মুখে।

ঢাকার উত্তরা একটি উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, যেখানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন, বিপণিবিতান রয়েছে। এই এলাকায় একটি স্কুলের ওপর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২৭ জনের প্রাণহানি এবং দেড় শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয় এটি সামরিক উড্ডয়ন নীতির বড় ধরনের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়। এখানে একটি প্রশিক্ষণ বিমানের ইঞ্জিন ফেল বা নিয়ন্ত্রণ হারানো যে ক্ষতির সৃষ্টি করতে পারে, তা এ দুর্ঘটনায় স্পষ্ট। এই দুর্ঘটনাস্থল ছিল বেসামরিক শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনী তার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ চালাবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণ যদি সাধারণ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা ‘নাগরিক সুরক্ষা’-এর পরিপন্থী। তাহলে এই মুহূর্তে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে, এই করুণ দলবদ্ধ মৃত্যুর দায় কে নেবে? কারা পাশে দাঁড়াবে নিহত-আহত শিশু পরিবারের পাশে? আমরা কোন পক্ষের কাছে, দায়িত্বশীল আচরণ আশা করব? অন্যদিকে এমন ঘটনা ঘটার পর রাষ্ট্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে যদি দায় স্বীকার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ দৃশ্যমান না হয় তাহলে জনমনে সন্দেহ এবং ক্ষোভ জন্ম নেবে। উত্তরার এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে রাজধানীর আকাশ প্রশিক্ষণ ফ্লাইটের জন্য উপযুক্ত নয়। প্রশিক্ষণ করিডর এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের একটি সময়োপযোগী, মানবিক, এবং যুক্তিনির্ভর পুনর্বিবেচনা করা দরকার। জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি নাগরিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই সুমহান সত্যটিকে উপেক্ষা করে আগামীর পরিকল্পনা নিতে হবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে। এর ফলে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জনবহুল এলাকায় এমন বিমান প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া এখন আর কেবল অযৌক্তিক নয়, নির্বুদ্ধিতার পর্যায়ে পড়ে। এতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা থেকে মানুষকে মুক্ত করে আনতে হলে, প্রথমত সরকারের কিছু কঠিন নীতি ও আইন বাস্তবায়ন দরকার। এরপর সামরিক বাহিনীকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভাবার জন্য অনুরোধ জানাই।

লেখকঃ সাংবাদিক, যুক্তরাজ্য

Shahedshafiq24@gmail.com