সেবাহীন পৌরসভায় অস্বচ্ছ কর বিল

নাটোরের বাগাতিপাড়া পৌরসভায় নাগরিক সুবিধার চরম ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করেই বাসায় বাসায় পৌরকর বাবদ অতিরিক্ত মোটা অঙ্কের বিল পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের নির্দেশ থাকলেও বিলের অস্বাভাবিক অঙ্ক, বকেয়া দেখানোর পদ্ধতি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি। এমন বাস্তবতায় পৌরবাসীরা দাবি জানাচ্ছেন, কর নয়, আগে চাই জবাবদিহি ও সেবার নিশ্চয়তা।

নাগরিকদের অভিযোগ, একাধিক বছরের বকেয়া যুক্ত করে অগ্রিম কোনো আলোচনা বা জানানো ছাড়াই কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকেরই একই বাড়িতে একাধিক করের বোঝা চাপানো হয়েছে। অথচ পৌরসভার ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও নাগরিক সুবিধার দিক দিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। নেই সুপেয় পানির সরবরাহ, নেই নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, নেই সড়কবাতি।

ফলে রাতে অন্ধকারে ডুবে থাকে পুরো পৌর এলাকা। নেই ময়লা ফেলার ব্যবস্থা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। অর্ধেকের বেশি রাস্তা এখনো কাঁচা। নাগরিকদের অভিযোগ, এসব সেবার উন্নয়ন ছাড়া অতিরিক্ত কর চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক।

এ বিষয়ে পৌরসভা সূত্রে জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে পৌরকর পরিশোধের জন্য ডিজিটাল বা ক্যাশলেস পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা এখন থেকে অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কর পরিশোধ করতে পারবেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল কর পরিশোধে স্বচ্ছতা ও সহজতর পদ্ধতি চালু করা। আর অতিরিক্ত যে বিষয়গুলোর উপর কর নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি পূর্ববতী দায়িত্বপ্রাপ্ত পৌর প্রশাসক এর সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়েছে। তবে কর আরোপকরা ওই সকল সুবিধা থেকে পৌরবাসী বঞ্চিত বলে জানান কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, ২০০৪ সালে বাগাতিপাড়া সদর ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হয় বাগাতিপাড়া পৌরসভা। এর আয়তন ১০.৪২ বর্গ কিলোমিটার। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী পৌর এলাকার জনসংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার ২৩০ জন। এটি একটি ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে।

পৌরসভার লক্ষণহাটি মহল্লার বাসিন্দা ফজলুর রহমান(৩৫) বলেন, যেখানে নাগরিক সেবা নেই, সেখানে কর আদায়ের যৌক্তিকতা কোথায়। পরিষ্কার রেইট, বিদ্যুৎ রেইট সারচার্জ, রিবেট এই সকল নতুন নাম সংযোজন করে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়েছে। যার কিছুই বুঝিয়ে বলা হয়নি। হঠাৎ করে এমন বিল আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওই একই মহল্লার বাসিন্দা এলবাস আলী জানান, আমি ও আমার ছেলে তুফান আলী (বাবু) একই পরিবারে বসবাস করি। আমাদের বাড়ির হোল্ডিংও একটি, এবং আমরা একই হাড়িতে রান্না করে খাই। অথচ পৌরসভা কর্তৃক আমার নামে ২৭৮৮ টাকা এবং ছেলের নামে ২৯৮৮ টাকা করে পৃথকভাবে কর ধার্য করা হয়েছে। একই পরিবারের সদস্য হয়ে, একই বাড়িতে বসবাস করেও আমাদের ওপর দুইজনের নামে আলাদা কর চাপানোটা আমার বোধগম্য নয়।

অতিরিক্ত কর আরোপের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। নাগরিকদের প্রশ্ন যে পৌরসভা এখনো নিজের রোলার বা ট্রাক মেরামত করতে পারেনি, যে পৌর ভবন থেকে মেইন রোডে ওঠার রাস্তা এখনো কাঁচা, সেই পৌরসভা কীভাবে অতিরিক্ত কর আদায়ের নৈতিক অধিকার রাখে।

সোনাপাতিল মহল্লার বাসিন্দা ও সমাজ সেবক এএম হাসান জাহিদ বাবু (৫৫) জানান, পৌরসভার মাধ্যমে আলোর সুবিধা নাই, সুপেয় পানি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা কোনো রকম সুযোগ-সুবিধাই তারা পান না। কিন্তু কোনো কিছু করতে গেলে পৌরসভা তাদের কাছ থেকে কর বুঝে নেয়। এমনকি কর পরিশোধ ছাড়া একটি স্বাক্ষর মেলে না কোনো কাগজে।

তিনি বলেন, আমরা সব করই দিতে প্রস্তুত কিন্তু সেবা নিশ্চয়তা দেখাই নিতে হবে।

এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।