থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়ার শতবর্ষী বিরোধ যে কারণে

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে চলমান সীমান্ত সংঘাতের ইতিহাস শত বছরেরও পুরনো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আসা বিরোধের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ।

ঔপনিবেশিক অতীতের প্রভাব
১৮৬৩ থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ফরাসি উপনিবেশকালে আঁকা মানচিত্রই আজও বিবাদের মূল কারণ। থাই বিশেষজ্ঞ থিটিনান পংসুধিরাকের, ফ্রান্স ও তৎকালীন সিয়াম রাজ্যের (বর্তমান থাইল্যান্ড) মধ্যে তৈরি মানচিত্রই আজকের উত্তেজনার ভিত্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সিয়াম কম্বোডিয়ার কিছু এলাকা দখল করলেও ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের কাছে তা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭৯ সালে কম্বোডিয়ার খেমাররুজ সরকারের পতন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তবে ২০০৮ সালে এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়, যখন কম্বোডিয়া একাদশ শতাব্দীর প্রাচীন প্রেয়া ভিহিয়ার মন্দিরকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তের চেষ্টা করে। ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে ২৮ জন নিহত ও হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষ
গত ২৮ মে কম্বোডিয়ান এক সৈন্য থাই সেনাদের সাথে গুলিবিনিময়ে নিহত হলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। উভয় পক্ষই আত্মরক্ষার দাবি করায় সীমান্তে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয় ও শান্তি আলোচনা বন্ধ থাকে।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) ভোরে কম্বোডিয়ার সেনাবাহিনী থাইল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে হামলা চালায়। ভারী অস্ত্র ও রাশিয়ান গ্রাড রকেট ব্যবহার করায় থাই সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। জবাবে থাইল্যান্ডের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাল্টা হামলা চালায়।

আন্তর্জাতিক রায় ও মত
১৯৬২ ও ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালত প্রেয়া ভিহিয়ার মন্দির ও সংলগ্ন এলাকায় কম্বোডিয়ার সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দিলেও থাইল্যান্ড তা মানতে নারাজ। ১৯০৭ সালের ফরাসি মানচিত্র অনুযায়ী কম্বোডিয়া তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করলেও থাইল্যান্ড সেই মানচিত্রই প্রত্যাখ্যান করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো প্রেয়া ভিহিয়ার মন্দিরটি শিবের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা বৌদ্ধ মঠে রূপান্তরিত হয়। খমের রাজা প্রথম ও দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের আমলে নির্মিত এই মন্দির এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। ১৯৬২ ও ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালত-এর রায়েও মন্দিরটি নিয়ে থাইল্যান্ডের আপত্তি অব্যাহত থাকে।

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা
গত কয়েক মাসে দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড থেকে ফল ও সবজি আমদানি বন্ধ করেছে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা আমদানিও স্থগিত করেছে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ডও সীমান্তে সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে।

শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা
থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই এই বিরোধকে ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেটও শান্তিপূর্ণ সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সশস্ত্র আগ্রাসনের জবাব সশস্ত্র প্রতিরোধ দিয়েই দেওয়া হবে।

সংঘাতের ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে উভয় দেশেই শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে, যা সংঘাত নিরসনকে জটিল করে তুলছে। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেট তার পিতা হুন সেনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন, যিনি জাতীয়তাবাদী ইস্যুতে জোর দিতে আগ্রহী। থাইল্যান্ডেও জোট সরকারের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক গত এক দশকের মধ্যে সর্ব নিম্নস্তরে পৌঁছেছে।