পিআর পদ্ধতি নিয়ে জটিলতা?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো, হঠাৎ করে প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনব্যবস্থায় (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন- পিআর) যাওয়ার জোরালো দাবি। সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যখন নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর চলছে প্রস্তুতি, ঠিক তখনই কিছু রাজনৈতিক দল ও তাদের মতাদর্শী বিশ্লেষকের মধ্যে পছন্দ অনুযায়ী নির্বাচনীব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের প্রীতি চোখে পড়ার মতো। প্রশ্ন উঠছে, এই প্রীতির পেছনে কী রয়েছে? গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা, নাকি বিষয়টি মূলত দীর্ঘদিন ধরে চলমান নির্বাচনী নিয়মের ফলে, পরাজয়ের ভীতিজনিত কারণে কৌশলগত অবস্থান? ২০০৭/৮ সালের ফখরুদ্দীন সরকারকে বলা হতো ‘সেনা সমর্থিত সরকার’, বাস্তবেও তাই ছিল। আর বর্তমান ইউনূস সরকারকে বলা হচ্ছে ‘জামাত-এনসিপি সমর্থিত সরকার’, যাদের আদেশ ছাড়া সরকারের পাতাও নাকি নড়ে না। অনেকে বলেন এই সরকার গোয়ালে আছে কিন্তু কিতাবে নেই। একটি জাতীয় দৈনিকের গোলটেবিল বৈঠকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেও আরেকটা সরকার আছে বলে অকপটে বলেছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সরকারের শিরা-উপশিরায় নাকি ঢুকে পড়েছে তাদের মতাদর্শীরা। ফলে সরকার হয়ে পড়েছে দিগ্ভ্রান্ত। কথাগুলো কতটুকু সত্য বা বাস্তবসম্মত, তা জানা নেই। তবে যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এ বিষয়ে নিশ্চিত ধারণা না থাকলে, বা কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়া মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

১৫ বছরের বহুমাত্রিক আন্দোলন মূলত একদফায় নেমে আসে শুধু একটি কারণে, আর তা হলো একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যর্থতায়। সুতরাং একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচন আয়োজনই ছিল এই সরকারের প্রথম সংস্কার। অথচ একটি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গত ১ বছরেও নিতে পারেনি। নির্বাচন হলো একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা বা সময়ের ‘অ্যাকশন পয়েন্ট’, আর সংস্কার হলো সময়ক্রমে প্রকাশিত একাধিক ঘটনা বা ঘটনার ধারাবাহিকতা, যা প্রায়ই কোনো না কোনোভাবে পরস্পর সম্পর্কিত বা সংযুক্ত। কিন্তু বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, ‘সংস্কারের শাক দিয়ে নির্বাচনের মাছ ঢাকতে ব্যস্ত সরকার। যেখানে তারা জানে, নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়, আবার নির্বাচন না দিয়েও সংস্কারের সুফল নিশ্চিত নয়। তাই এই নির্বাচনের সিদ্ধান্তটি নেওয়া ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু বিগত সব নির্বাচনের ফলাফলে জামাত হতাশাগ্রস্ত, তাই নির্বাচনের কথায় তারা ‘ভোটাতঙ্ক’ রোগে ভুগে। অনেকটা সেই আওয়ামী লীগের সরকারের মতো।’ ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হলেও ২২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি আসন পায়। মোট ভোট পেয়েছিল ১২.১৩ শতাংশ, সেই হিসাবে পিআর পদ্ধতিতে ন্যূনতম ৪৮টি আসন পেতে পারত। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয় এবং মাত্র ৩টি আসনে জয়লাভ করে, মোট ভোট পেয়েছিল ৮.৬২ শতাংশ, সেই হিসাবে ২৫টি আসন পেতে পারত। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে যায় এবং বিএনপি ৩০টি আসন ছাড় দিলেও মাত্র ১৭টি আসনে জয়লাভ করে। মোট ভোট পায় মাত্র ৪.২৮ শতাংশ। সেই হিসাবে জোট হয়ে নির্বাচন করায় জামাত পিআর পদ্ধতির চেয়ে বেশি আসন লাভ করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনটি শ্রেষ্ঠ নির্বাচনে জামাতের ভোট এবং আসন, ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে। অর্থাৎ ১৯৯১ থেকে ২০০১, দশ বছরে ভোটের স্যংখা ৭.৮৫ শতাংশ কমে যায়। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হয়ে মোট ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ২টি আসনে জয়লাভ করে, অর্থাৎ ৩৭টি আসনেই পরাজয় ঘটে দলটির। প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা ৪.৬ শতাংশ। সেই হিসাবে কমপক্ষে ১৩টি আসন দাবি করতে পারত। কিন্তু ২টি আসনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় এই দলটিকে। সুতরাং এখন তারা এমন একটি ব্যবস্থা চান, যেখানে পরাজয়ের গ্লানি থাকবে না। কিন্তু বাড়বে আসন সংখ্যা। তাই বর্তমান এফপিটিপি ব্যবস্থায় অনীহা এই দলটির। অন্যদিকে, গত এক বছরে কয়েকটি জরিপের ফলাফল দেখে এখন এনসিপিরও একই অবস্থা। প্রতিটি জরিপেই তারা পিছিয়ে আছে। যেহেতু তাদের ভোটারের সংখ্যা নিয়ে অতীতের কোনো তথ্য নেই, তাই তারা পুরোপুরি নির্ভর ছিল তরুণ ভোটারদের ওপর। মূলত সেই সব ভোটার, যারা গত ১৫ বছর কোনো ভোট দিতে পারেনি। কিন্তু সর্বশেষ সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর জরিপেও তরুণ ভোটারদের প্রথম পছন্দ বিএনপি। এটি দেখে দলটি হতাশ হয়ে পড়েছে। একদিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী দলের প্রতীক না পাওয়া, নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা, অন্যদিকে সব জরিপে পরিষ্কার পরাজয়ের ইঙ্গিত, সব মিলিয়ে দলটি এখন ‘ভোট’ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। তবে এটা ঠিক, এই পরিস্থিতি যে কোনো সময় পাল্টে যেতে পারে। যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো স্থির হয়নি, তাই এনসিপির জনপ্রিয়তার পাল্লা যে ঊর্ধ্বমুখী হবে না সেই গ্যারান্টি নেই। আমাদের রাজনীতিতে কখন যে বাতাস কোন দিকে প্রবাহিত হয়, তা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। যে কারণে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। গত নভেম্বরে ভয়েস অব আমেরিকা বাংলার তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে এক জরিপে, দেশের ৬১.১ শতাংশ মানুষ দ্রুত নির্বাচন চায়। দেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এর সংখ্যা এখন হয়তো আরও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৩ জুন, তারেক রহমান এবং ড. ইউনূসের ঐতিহাসিক বৈঠকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের বিষয়ে একমত হওয়ায় অনেকে ‘বাড়া ভাতে ছাই’ দেওয়ার মতো অস্বস্তিতে আছে। শুরু হয় নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্র, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা। তাতে যোগ দেয় ফ্যাসিস্টদের দোসররা। গোপালগঞ্জের ঘটনার পর পর কিছু নেতা তো রীতিমতো প্রকাশ্যেই বলেন, ‘এই অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’

অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলছেন একইসুরে সুর মিলিয়ে জামাতের নেতারাও সেই কথা বলছেন। শুধুমাত্র মব সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ঔদ্ধত্বপূর্ণ কথাবার্তায় কি আর নির্বাচন পেছানো যাবে? তাই এমন একটি সংকট তৈরি করতে হবে যেন সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে। আর সেই সংকটের নাম পিআর বা প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় একটি দলের জাতীয়ভাবে প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বরাদ্দ পাবে। অথচ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে প্রতিটি আসনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী বিজয়ী হন। দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অভিযোগ থাকলেও, এই নির্বাচনীব্যবস্থা নিয়ে কোনো অভিযোগও নেই। পৃথিবীর গণতন্ত্রের সূতিকাগার যুক্তরাজ্যই বলেন কিংবা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারতই বলেন, তারাও এই একই পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করে সফলভাবে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রেখেছে। তাছাড়া বাংলাদেশে পিআর ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধনসহ নানা আইনি ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

ত্রয়োদশ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এসব পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। তাছাড়া পদ্ধতি কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন একটি জনগণের সরকার। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের জনগণ আদৌ পিআর-এর জন্য প্রস্তুত কি না? বেশিরভাগ ভোটার এখনো প্রার্থী ও দলভিত্তিক ভোট দেন, অনেক সময় ব্যক্তিভিত্তিক ভোটও দিতে দেখা যায়। ফলে দলগুলোও প্রার্থী নির্বাচনে স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নেয়, যেটি পিআর পদ্ধতিতে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। পিআর নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে সরকারকে। পিআর পদ্ধতির কোন মডেলটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য, তার সঠিক গবেষণা করা হয়েছি কি? ইউরোপের অনেক দেশের মতো পিআর-এর জটিল সমীকরণ আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ বুঝবে কি? ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, হঠাৎ করে কেন এই পিআর প্রীতি? এই প্রীতি কি দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনে কাক্সিক্ষত ফলাফল না পাওয়ার বেদনা থেকে? নাকি বর্তমান তরুণ ভোটারদের অনাস্থার প্রতিফলন থেকে? তবে কি যারা নির্বাচনী মাঠে বারবার পরাজিত হয়েছে বা জনসমর্থন হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে পিআর-ব্যবস্থাকে সমর্থন একধরনের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, না রাজনৈতিক কৌশল মাত্র? রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ, অতীত রেকর্ড এবং বর্তমান সময়ের কর্মকা- মিলিয়ে দেখলে মনে হয়, এই আকর্ষণ অনেকাংশে নির্বাচনী বাস্তবতা ও হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া একটি কৌশলগত প্রীতি। অতএব, যদি পিআর নিয়ে কোনো কার্যকর আলোচনা বা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হয়, তবে তা হওয়া উচিত জনমত, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক কাঠামো বিবেচনায়। কেবল পরাজয়ের ভীতির পরিপ্রেক্ষিতে নয়। আবার যদি সত্যিকার অর্থেই আতঙ্কিত দলের জনসমর্থন থাকে দেশব্যাপী, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গণতান্ত্রিক নির্বাচনীব্যবস্থাতেও তারা জয়ী হবেন। এরইমধ্যে সেই আভাসও স্পষ্ট হচ্ছে। সমস্ত জরিপই যে বাস্তবসম্মত, তা কে বলেছে? প্রকাশিত জরিপের ফলে সত্যিকার অর্থে জনমত কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক ও ব্রডকাস্টার

jobairbabu44@gmail.com