গুজব হট্টগোল উতলা সমাজ

মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যখন ধ্বংসের বিস্তার আর বহু হতাহতে দেশ শোকস্তব্ধ, তখন স্বার্থবাদী মহল চালিয়েছে অপতৎপরতা। ছড়ানো হয়েছে নানা গুজব। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে উসকে দেওয়া হয়েছে অবরোধ, বিক্ষোভ, জন-জটলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আরও সরাসরি বললে মোবাইল ফোনে চালানো হয়েছে, অবিশ্বাস্য রকমের কাহিনির লেনদেন। এমন গুজববাজি সমাজকে কতটা উত্তপ্ত করে দিতে পারে, স্বচক্ষে আমরা তা দেখেছি, গত সোমবার দুর্ঘটনার দুপুর থেকে পরদিন। দেশ রূপান্তরসহ অন্য সহযোগী পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলোতেই বোঝা গেছে, মোবাইল ফোনে গুজব চালাচালির বিষময় ফলাফল। একটি দুর্ঘটনা এবং পরবর্তী হৃদয়বিদারী চিত্রে যখন সবাই হতবাক, শোকাকুল তখন গুজব কারবারিরা ব্যস্ত তাদের কুকর্মে। এই চিত্র বৈপরীত্য বিবেকবান মানুষকে উদ্বেগতাড়িত না করে পারে না। আমরা মানুষের এই স্বাভাবিক উদ্বেগ আশ্রয় করে বলব, গুজববাজি রুখতে সরকারকে যথাবিহিত জরুরি কার্যক্রম গ্রহণে এগোতে হবে। দেশের ভেতরে এবং বাইরে অবস্থানরত গুজববাজদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে এবং এদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সব সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাধীন গণমাধ্যমে জোর প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের তথ্যপ্রবাহ হতে হবে সঠিক, তাৎক্ষণিক, পূর্ণরূপে নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ততার সব উপাদানে ভরপুর। সমাজের সব অংশকে তথা পেশাভিত্তিক সামাজিক শক্তিকে সক্রিয় করে রাষ্ট্রীয় তথ্যপ্রবাহের অনুকূলে কাজে লাগাতে হবে। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুলে সংঘটিত দুর্ঘটনার প্রথম শিকার বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানটি। সেটি বিধ্বস্ত হয়েছে, পাইলট নিহত হয়েছেন এবং দুর্ঘটনায় ধ্বংসের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে স্কুলটিতে। এখানে আপতিত দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মৃত্যু ও ধ্বংসের কবলে নিপতিত হয়েছে স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মী, অভিভাবক, স্কুল ভবন এবং স্কুলের অন্য কাঠামো-সম্পদ ও আসবাবপত্র। এই পুরো চিত্রের কোনো ক্ষেত্রেই দূরের কিংবা কাছের অন্য কারও প্রত্যক্ষ সংশ্রব সংশ্লেষ থাকার কথা নয়। দুর্ঘটনার পর সরকারের দুজন উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব যখন সরেজমিন উপস্থিত হলেন তখন তারা হন অবরুদ্ধ। এক হতবাক করা কাণ্ড! আমাদের বিবেকবোধ কি নিরুদ্দিষ্ট?

দুর্ঘটনার প্রচণ্ডতা, ভয়াবহতা এবং মৃত্যু ও ধ্বংসলীলার অনির্ণেয় মাত্রায় গোটা এলাকা তখন হতবিহ্বল, এটাই স্বাভাবিক। ওই সময়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উচ্চ প্রতিনিধিদের অবরুদ্ধ করার চিন্তা কোনো বিবেচনাতেই স্বাভাবিক জন-আচরণ বলে গ্রহণ করা যায় না। একইভাবে ওই সময়ে সচিবালয়ে জবরদস্তি ঢুকে ভাঙচুর চালিয়ে অশ্রাব্য সেøাগান দিয়ে হৈ-হট্টগোল করে অযাচিত-অযৌক্তিক দাবি আদায়ের তোড়জোড়ে কী বুঝবে সমাজ? আমাদের সবাইকে এসব প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির তোড়ে। অবশ্য গত প্রায় বছর জুড়ে নানা সময়ে আমাদের এমন অনাকাক্সিক্ষত ধারার ঘটনাবলি দেখতে হয়েছে। দেখেছি, সচিবালয়ে শিক্ষার্থী-দঙ্গল জোর করে ঢুকে পড়েছে ‘অটো পাস’ দাবি নিয়ে। শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষা সচিবের পদত্যাগ চাইছে। কদিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চলেছে কর্মবিরতি, উঠেছে দাবির বহর। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন গেটে কত জন-ধরনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, ইয়ত্তা নেই। রাজধানীর ব্যস্ততম এবং অতি জরুরি সড়ক সংযোগস্থল শাহবাগ মোড়েও যখন-তখন সমাবেশ, অবরোধ এবং মারমুখী জটলাও বছর জুড়েই দেখতে হয়েছে আমাদের।

একটি মহত্তম ছাত্র-গণআন্দোলন থেকে উদ্ভূত ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে সমাসীন বিশ্বনন্দিত নোবেলজয়ী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এত ধরনা, এত দাবি, এত সমাবেশ কেন, এর যথার্থ উত্তর আমাদের পাওয়া দরকার। দেড় দশক ধরে জাতির ওপর চেপে বসে থাকা এক জবরদখলকারী কর্তৃত্ববাদী সরকারের আকস্মিক অবসানেই কি সব রুদ্ধ প্রাণ একযোগে জেগে উঠল? নানা স্তরে আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি। ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা প্রশ্নে পরিস্থিতির মূল্যায়নে অনেক বিষয় সমগ্র দেশবাসী এবং সরকারের সামনে উঠে এসেছে। এর যথাযথ সার সংকলন করে নির্দিষ্ট উত্তরে পৌঁছার চেষ্টা যদি এখনো করা না হয় তবে বলতে হবে, আমরা জনসাধারণের মন-মেজাজ-মর্জি বোঝার চেষ্টায়রত না হয়ে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে রয়েছি। দীর্ঘ জবরদস্তিমূলক, বিরুদ্ধ ও ভিন্ন মতাবলম্বীর ওপর নিপীড়নপ্রবণ শাসকের অপসারণে সমাজের নানা অংশের যত আকাক্সক্ষা বেগবান হয়ে ওঠে। এতদিনের যত অবদমিত চাওয়া, তার সবকিছুর সরব উচ্চারণ এবং সব দাবির প্রাপ্তি ও স্বীকৃতির জন্য সমাজ হয়ে ওঠে উতলা। দেশবাসীর নিরঙ্কুশ সমর্থন-লব্ধ বর্তমান সরকারের কাছে জনদাবির এই কলরব খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সরকারের অন্তর্বর্তী অবস্থান বিবেচনায় সভ্যতা ও পরিমিত বোধে সমাজকে হতে হবে সংযত ও নিয়মানুগ। পঞ্চাশ বছরের পুরনো এ রাষ্ট্রে এ সত্য আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে। একই সঙ্গে বলব, প্রাজ্ঞ সরকার নাগরিকবৃন্দকে তাদের হৃত রাজনৈতিক অধিকার পূর্ণ ও যথার্থরূপে প্রয়োগের ব্যবস্থা করে দিন দ্রুততম সময়ে। আমরা বলব, রাষ্ট্র ও নাগরিককুল যত দ্রুত নির্বাচনমুখী হবে ততই সভ্যতার প্রধানতম মানদণ্ড গণতন্ত্রের চেতনায় দেশ হবে জাগ্রত, সমাজ হবে বিবেচনাবোধে, নিয়মানুগ আচরণে সমৃদ্ধ।