গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে অভিযান সাময়িক বন্ধ রাখবে ইসরায়েল

ইসরায়েলি অবরোধের ফলে ফিলিস্তিনের গাজায় হাজার হাজার বাসিন্দার ক্ষুধার্ত ছবি বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ অবরোধ তুলে নিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক চাপের মুখে অবশেষে সীমিত সময়ের জন্য অবরোধ তুলে নিয়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টার জন্য গাজা উপত্যকার কিছু অঞ্চলে সামরিক অভিযান বন্ধ রেখে নতুন মানবিক করিডর খোলা হবে।

সেনাবাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালাহ এবং গাজা সিটিতে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলবে।

এছাড়া, রবিবার থেকে সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খাদ্য ও ওষুধবাহী গাড়ির জন্য নির্ধারিত নিরাপদ রুটও খোলা থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

এ ঘোষণায় গাজার বহু মানুষ কিছুটা স্বস্তি হিসেবে দেখলেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী তামের আল-বুরাই বলেন, ‘মানুষ খুশি যে আজ অনেক খাবার গাজায় আসবে। আমরা আশা করি আজকের দিনটি এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের শেষের প্রথম ধাপ হবে।’

তবে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন সহায়তা আদৌ নিরাপদে মানুষের হাতে পৌঁছাবে কিনা। গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা সুআইব মোহাম্মদ বলেন, ‘ একটি যৌক্তিক উপায়ে সহায়তা প্রবেশ করতে হবে। বিমান থেকে ফেলা হলে সেটি অনেক সময় আহত করে এবং ক্ষতি করে।

এদিকে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা তাকে না জানিয়েই এটি নিয়েছেন।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এটি হামাসের প্রতারণার কাছে আত্মসমর্পণ’। গাজায় সব ধরনের সাহায্য বন্ধ, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করতে পুনরায় আহ্বান জানান। তবে তিনি সরকারের পদত্যাগের হুমকি দেননি।

ইসরায়েল বলছে, তারা মে মাসে সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল এবং দাবি করছে গাজায় যথেষ্ট খাদ্য আছে। তবে জাতিসংঘ বলছে, ইসরায়েলের বিধিনিষেধের মধ্যে তারা সর্বোচ্চ কার্যকরভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে।

গাজার হামাস-শাসিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিগত কয়েকদিনে অপুষ্টিতে ভুগে ডজনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত মে মাসে অবরোধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে অপুষ্টিজনিত কারণে, যার মধ্যে ৮৫ জনই শিশু।

মারাত্মক অপুষ্টিতে গতকাল শনিবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে পাঁচ মাস বয়সী জয়নাব আবু হালিব নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির মা ইসরা আবু হালিব বলেন, ‘তিন মাস ধরে হাসপাতালে ছিল, শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ পেলাম।’

মিশরের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, রবিবার তারা কেরেম শালোম সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ গাজার উদ্দেশ্যে ১০০টির বেশি ট্রাক পাঠিয়েছে, যেগুলোতে রয়েছে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যসামগ্রী।

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই, ইসরায়েল বিমান থেকে সাহায্য ফেলা শুরু করে—যা তারা বলছে, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি সহজ করার একটি প্রচেষ্টা।

মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো গত সপ্তাহে জানিয়েছে, গাজার ২২ লাখ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষুধা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যার প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

গত শুক্রবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামাসের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির আলোচনা পরিত্যাগ করে জানায়, ‘হামাস যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী নয়’।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিগুলো মানবিক সহায়তার পরিসর বৃদ্ধি করবে। তবে তারা ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছে, যথেষ্ট বিকল্প রুট না দেওয়ার জন্য—যার ফলে সহায়তা পৌঁছাতে বিঘ্ন ঘটছে।

ইসরায়েল বলছে, তারা গাজায় সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে কিন্তু সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যেন সেগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে না পড়ে। ইসরায়েল দাবি করছে, গাজায় যথেষ্ট খাদ্য প্রবেশ করানো হয়েছে এবং জনগণের দুর্দশার জন্য তারা হামাসকে দায়ী করছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামাসবিরোধী অভিযানে গাজার প্রায় ৬০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের বেশিরভাগই বেসামরিক। গোটা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং অধিকাংশ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।