বছরে ১০ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন ও আমদানি পরিকল্পনা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে যা সাংঘর্ষিক নীতি বলে জানিয়েছে গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম)।
মঙ্গলবার প্রকাশিত গ্লোবাল কোল মাইন ট্র্যাকার শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়ের আগে ৪০ শতাংশ ক্লিন এনার্জির লক্ষ্য অর্জন হলে ভবিষ্যতে কয়লা খনিগুলো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে যা একইসাথে পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
জিইএম এর প্রতিবেদন বলছে, দ্বিমুখী নীতির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে অর্জনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দেশটি এখনো কয়লা নির্ভরতার দিকেই এগোচ্ছে যা জাতীয় ও বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জিইএম এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী নতুন কয়লা খনির হার গত এক দশকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে-মাত্র ১০৫ মিলিয়ন টন নতুন উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৪৬ শতাংশ কম। ভারতের ও চীনের অনুমোদন প্রক্রিয়ার বিলম্ব, বাজার ভারসাম্য এবং উন্নয়ন বিলম্বের কারণেই এই পতন ঘটেছে।
তবে, ৩০টি দেশে ৮৫০টির বেশি কয়লা খনি প্রকল্প এখনো পরিকল্পনায় রয়েছে। চীন (১,৩৫০ মিলিয়ন টন), ভারত (৩২৯ মিলিয়ন টন), অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে এই পরিকল্পিত সক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি ধারণ করে।
জিইএম বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর ৩১ মিলিয়ন টন নতুন কয়লা উত্তোলনের সক্ষমতা নিয়ে অগ্রগামী ভূমিকা রাখছে। মূলত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে কয়লা উৎপাদন পরিকল্পনা বাড়াচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। এশিয়ার বাইরে মধ্য এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় কয়লা সম্প্রসারণ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে কয়লা উৎপাদন ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত ১ মিলিয়ন টনেরও কম। দেশের একমাত্র সক্রিয় খনি বড়পুকুরিয়া থেকে বছরে আনুমানিক ০.৯ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন হয়। তা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রস্তাবিত কয়লা খনি সক্ষমতার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন নতুন কয়লা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
যদিও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে কয়লার অবদান খুবই সামান্য মাত্র ৫.৫ শতাংশ। গ্যাস, তেল ও ঐতিহ্যবাহী বায়োমাস এখনো প্রধান উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। তবে ২০২০ সালে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর জন্য সরকার কয়লা আমদানি শুরু করে, এবং ২০২৩ সালের ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি) অনুযায়ী ২০৩০ সাল পর্যন্ত কয়লার চাহিদা বাড়তে থাকবে।
বাংলাদেশ সরকারের মতে, দেশীয় কয়লা খনির সম্প্রসারণ আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, ঐতিহ্যবাহী বায়োমাস থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে ঝুঁকেই খনি সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা দেখানো হচ্ছে।
তবে, সব কয়লা খনি প্রকল্প এখনো প্রাথমিক পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে, যদি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে রূপান্তর নির্ধারিত সময়ের আগেই বাস্তবায়িত হয়, তবে কয়লার চাহিদা শিগগিরই সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে হ্রাস পেতে শুরু করতে পারে। এতে প্রস্তাবিত কয়লা খনিগুলোর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বৈধতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রস্তাবিত সব কয়লা খনি বাস্তবায়িত হলে বছরে ১৫.৭ মিলিয়ন টন মিথেন নির্গত হতে পারে, যা জাপানের মোট বার্ষিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের চেয়েও বেশি, জাপান বিশ্বের শীর্ষ ১০ নিঃসরণকারী দেশের একটি। এই খনির উন্নয়ন পরিকল্পনা প্যারিস চুক্তির জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ও জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে কয়লা উৎপাদন ৩৯ থেকে ৭৫ শতাংশ হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছে, ২০২০ সালের ৭,৬০৭ মিলিয়ন টন উৎপাদনের ভিত্তিতে। বর্তমান খনি প্রকল্পের পরিকল্পনা এই লক্ষ্য থেকে আরও বিচ্যুতি সৃষ্টি করবে।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটর-এর গ্লোবাল কয়লা খনি ট্র্যাকার প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডোরোথি মেই বলেন, ‘আক্ষরিক ও রূপকভাবে বললে ‘ক্যানারি ইন দ্য কোল মাইন’ এখনো আমাদের সতর্ক করছে। নতুন খনি পরিকল্পনা দ্রুত বাতিল না করলে, ব্যাপক মিথেন নিঃসরণ ভবিষ্যতে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব করে তুলবে।’