স্কুলে কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক হোক

অনেক দিন ধরে বলা হচ্ছে, দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজে একজন ‘কাউন্সেলর’ রাখার জন্য। বিশেষ করে স্কুলে। সেই বয়সের একজন শিক্ষার্থী নিজস্ব যুক্তি বা কোনো বাস্তবতাকে মানিয়ে নিতে পারে না। তারা প্রায়ই এমন সামাজিক কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়, যা তাদের মনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে। ফলে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ তারা হারিয়ে ফেলে। এ বিষয়ে না স্কুল কর্তৃপক্ষ, না সরকার কেউই তেমন গুরুত্ব দেয় না। বিভিন্ন সময় সরকারকে বলা হয়েছে এ বিষয়ে নজর দেওয়ার জন্য। কিন্তু সরকার এক কান দিয়ে শুনেছে, অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। সেই কথা বিন্দুমাত্র গুরুত্ব পায়নি। বিভিন্ন পেশাজীবী, অভিভাবক এবং স্বয়ং শিক্ষার্থীরা যখন এ বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলেছে, তখন তারা তেমন গুরুত্বই দেয়নি। কিন্তু বর্তমানকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।

জানা যাচ্ছে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও কর্মকর্তারা আতঙ্কে থাকার ফলে তাদের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক করতে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিমানবাহিনী ও ব্র্যাক বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের এ সেবা চালু করেছে। গত সোমবার থেকে তাদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। বিমানবাহিনীর অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। সেদিন রোগীর সংখ্যা ছিল ১১৯ জন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১১০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা চলবে। এ কাউন্সেলিং ইউনিটে প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ কাউন্সেলররা (পরামর্শদাতা) সেবা দিচ্ছেন। কাউন্সেলিং সাধারণত আলাপচারিতা-ভিত্তিক হয় এবং ভুক্তভোগীকে তার সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। কিন্তু একজন কাউন্সেলর চিকিৎসকের মতো দায়িত্ব পালন করেন না।  তিনি মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন পেশাদার-মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের সঙ্গে মিলে রোগীর থেরাপির দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছর আগের সরকার বলেছিল কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের মানসিক চাপ সামলানোর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘মনোবিদ’ নিয়োগ  দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তখন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও স্কুলে পরামর্শক বা কাউন্সেলর এবং মনোবিদ নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না তা জানতে  চেয়ে একটি রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। এরপর আর কোনো খবর নেই।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার শিকার শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য কাউন্সেলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঘটনা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং কাউন্সেলিং তাদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে, যারা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল বা যারা হতাহতদের স্বজন, তাদের জন্য কাউন্সেলিং আরও বেশি জরুরি। তাদের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে কাউন্সেলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে কারণে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বিশেষ কমিটি গঠন, আউটডোর সেল চালু, হাসপাতালের আন্তঃবিভাগে বেড সংরক্ষণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে আউটরিচ সেবা চালু এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের (বিএসপি) সমন্বয়ে হটলাইন সেবা চালু হয়েছে। স্কুলে কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে একটি জার্নালে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের মানসিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত চাহিদা পূরণের জন্য কাউন্সেলিং অপরিহার্য বিষয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের উচিত, মাইলস্টোন থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মাইলস্টোনের বাইরেও প্রতিটি স্কুলের জন্য কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ। যা শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক, সামাজিক এবং শিক্ষাচিন্তা বিকাশে সহায়তা করে। এটা সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক করা উচিত। শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতার প্রতি আমরা কবে সচেতন হব?