বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ

ভালোবাসার স্পর্শ সুস্থ জীবনের শুরু

প্রতিবছর আগস্ট মাসের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ বা World Breastfeeding Week (WBW)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ১৯৯২ সালে এ দিবসটির সূচনা হয়। মাতৃদুগ্ধ হলো শিশুর প্রথম ও সর্বোত্তম খাবার। এটি শিশুর দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করে এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়। মাতৃদুগ্ধ শুধু একটি খাবার নয়, এটি শিশুর সঙ্গে মায়ের মানসিক বন্ধনের প্রতীক।

শুধু মাতৃদুগ্ধ পান করালে, বছরে আট লাখের বেশি শিশুর জীবন রক্ষা পাবে। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশু দুজনেরই উপকার হয়। জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ দিলে মায়ের গর্ভফুল তাড়াতাড়ি পড়ে, সহজে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়।  ফলে মা রক্তস্বল্পতা থেকে রক্ষা পায়। জন্মবিরতিতে সাহায্য করে, স্তন ও জরায়ুর ক্যানসার এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়। শিশুর সর্বোচ্চ শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ডায়রিয়া হওয়ার প্রবণতা এবং এর তীব্রতার ঝুঁকি কমায়, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং কানের প্রদাহ কমায়, দাঁত ও মাড়ি গঠনে সহায়তা করাসহ অনেক উপকার করে।   মায়ের দুধ না খাওয়ালে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৫ গুণ বৃদ্ধি পায়, ডায়রিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১১ গুণ বৃদ্ধি পায়, শিশুদের অপুষ্টি ও অন্যান্য কারণে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১৪ গুণ বৃদ্ধি পায়। শারীরিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বয়সের তুলনায় ওজন অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়; দীর্ঘস্থায়ী রোগের (ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা) ঝুঁকি বাড়ে। বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বে প্রতি পাঁচ শিশুর তিনজনই জন্মের প্রথম ঘণ্টায় মাতৃদুগ্ধ পায় না।

দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যপান করাতে পারলে বছরে ৮ লাখ ২০ হাজার শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। দুগ্ধদান করে মায়েরাও জীবনসংহারী অনেক রোগ ঠেকিয়ে দিতে পারেন। সেজন্য তাদের আরও উৎসাহিত করতে বলেন চিকিৎসকরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, জন্মের প্রথম ঘণ্টাতেই নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধই খাবে শিশু, এমনকি পানিও খাওয়ানো যাবে না। এরপর পরিপূরক খাদ্যের সঙ্গে অন্তত দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ চালিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ পালিত হয়ে আসছে ১৯৯২ সাল থেকে। কিন্তু এখনো জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো হয় বিশ্বের মাত্র ৪১ শতাংশ শিশুকে। এই হারকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি। আর আমাদের দেশে হাজার হাজার মা বুকের দুধ পান করানোর পরিবর্তে, বাজারের কৃত্রিম দুধ পান করান নিজের সৌন্দর্যকে ধরে রাখার জন্য। এতে লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ জীবন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে শিশুর।

শিশুর রোগপ্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ মায়ের দ্রুত আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। পৃথিবীতে সম্ভবত সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মাতৃগর্ভ। এরচেয়ে নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত ও আরামদায়ক স্থান সম্ভব নয়। সেখান থেকে একজন নবজাতক যখন ধুলোবালি মাখা জীবাণু সংকুল পৃথিবীতে আসে, তার নাজুক শরীর ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতার কারণে জীবন হয় ঝুঁকিপূর্ণ! এই পরিবেশে একটি নিরাপত্তাবেষ্টনীর মতো তাকে সব প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে মমতাময়ী মায়ের কোল ও শিশুর রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতার অসাধারণ গুণাবলি সমৃদ্ধ মাতৃদুগ্ধ! আমাদের দেশে এই ব্যাপারটি অত্যন্ত অবহেলিত কারণ ধরেই নেওয়া হয় যিনি জন্ম দিলেন তিনি তো স্তন্যদান করবেনই, এটা তার একার দায়িত্ব এবং অবধারিত ব্যাপার। বিষয়টি এত সহজ নয়, আর সে কারণেই দেখা যায় শেষ পর্যন্ত অনেক সদ্য প্রসূতির সন্তান মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত শিশুরা বিভিন্ন রোগে সহজে আক্রান্ত হয় এবং অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কৃত্রিম শিশুখাদ্যে লালিত শিশুদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মাতৃদুগ্ধে লালিত শিশুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এসব রোগ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেকগুণ বৃদ্ধি করে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

১. ব্রেস্টফিডিং বা স্তন্যদানে সবচেয়ে প্রথম এবং প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মায়ের সুস্বাস্থ্য (শারীরিক ও মানসিক দুটোই)। গর্ভবতী মায়ের দেহে বিভিন্ন হরমোনের আধিক্য দেখা যায়, বলা যায় গর্ভবতীর শরীরে চলে হরমোনের উৎসব। যার ফলে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ প্রভাবিত হন। শিশু জন্মের পর এই প্রভাব কিছুটা কমে এলেও তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। শিশুর লালন-পালনে আর সব কিছুর মতো মাতৃদুগ্ধ দানে মায়ের পাশাপাশি পিতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় ব্যাপারটি অনেককে অবাক করলেও এটাই বাস্তবতা।

২. এ সময় মায়ের যথাযথ খাদ্যগ্রহণ ও পুষ্টি জরুরি। মায়ের পুষ্টিহীনতা মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ সময় সাধ্য অনুযায়ী দুধ, ডিম, সবজিসহ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুার।

৩. স্তন্যদানকারী মায়েদের হাইড্রেশন বা পর্যাপ্ত পানি পান অত্যন্ত জরুরি।

৪. মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম দরকার। 

স্তন্যপান করানোর উপকারিতার ব্যাপারে প্রত্যেক মাকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে হবে। শিশুদের শারীরিক, মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের বুকের দুধ খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এটি শিশুর জন্য মায়ের কাছে অধিকার বা প্রাপ্য। মায়ের দুধপান করা শিশুর মৃত্যুহারও একেবারে কম। বিশ্বের ১৭০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও যেহেতু এই সপ্তাহ পালন করা হবে, ফলে সচেতনতা এবং কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক : চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

drmazed96@gmail.com