বিতর্ক বিষাদ বিপন্ন

জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী অনেকেরই আশা ছিল, অভ্যুত্থানের আগে ও পরে বাংলাদেশ এক রকম থাকবে না। দেশ চলবে গণতন্ত্রের পথে, দুর্নীতি সম্পূর্ণ বন্ধ করা না গেলেও মাত্রা কমবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, দুঃশাসন থাকবে না, পুলিশ এবং প্রশাসন জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাবে না, বিচার বিভাগ শ্রদ্ধা এবং সমীহ অর্জন করবে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন চেহারা নিয়ে দাঁড়াবে। যদিও বামপন্থিরা সবসময় বলে আসছে রাষ্ট্রের চেহারা বদল করতে হলে, চরিত্র বদল করতে হবে। দেশের অবস্থা বদলাতে হলে ব্যবস্থা বদল করতে হবে। কথা যুক্তিসংগত হলেও  সাংগঠনিক দুর্বলতা আর ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণার কারণে বামপন্থিদের কথা দেশের মানুষের কাছে যেমন পৌঁছে না, তেমনি যারা শোনেন তার গুরুত্ব তো দেনই না বরং উপেক্ষা করেন। কিন্তু সত্য উপেক্ষা করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণসহ হাজির হয়ে যায়। এ রকম ঘটনা ঘটছে বারবার। যে কোনো বড় পরিবর্তন মানুষের আশাবাদকে আকাশচুম্বী করে তোলে। বাংলাদেশ এক অর্থে আন্দোলন, অভ্যুত্থান আর আশাভঙ্গের দেশ। আন্দোলনের পরে অভ্যুত্থান করে আর আশাভঙ্গ হয় বলে, আবার আন্দোলনে নামে। আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় মানে যে সাফল্য অর্জিত হওয়া নয়, তা বাংলাদেশের জনগণের চাইতে আর বেশি কেউ বুঝতে পারে না। তাই হতাশার মেঘ বেশিদিন স্থায়ী হয় না, আন্দোলনের ঝড়ো হাওয়ায় তা দূর হয়ে যায় এবং মানুষ আবার বিপুল উদ্যমে পরিবর্তনের তীব্র আকাক্সক্ষায় পথে নামে। এ কারণেই শত ব্যর্থতা আর হতাশার পরও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল। আওয়ামী লীগ টিকে থাকার সব চেষ্টা, অপচেষ্টা ও আক্রমণ চালিয়েও জনগণের আন্দোলনকে দুর্বল ও দমন করতে পারেনি।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি যে শ্রমিক, সাধারণ মানুষ, নারী শিশুরাও অংশ নিলেন এবং জীবন দিলেন এর পেছনে প্রেরণা কী ছিল? সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ৮৪৪ জন জীবন দিয়েছেন এই আন্দোলনে যাদের মধ্যে ৭৯ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে এবং কমপক্ষে ১৩৩ জন শিশু ছিল। সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি শ্রমজীবী মানুষ, যাদের সংখ্যা ২৮৪ জন এরপরই রয়েছে শিক্ষার্থী যাদের সংখ্যা ২৬৯ জন। এ ছাড়াও রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১২০ জন, চাকরিজীবী ১০৮ জন, গৃহিণী, পথচারীসহ অন্যান্য ২৯ জন। অর্থাৎ ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন সমাজের সব স্তরের মানুষ। একটা চূড়ান্ত স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করাই ছিল লক্ষ্য। এই সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ পালিয়ে গেলে তাদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর যে হামলা হয়, তাতে মৃত্যুর সংখ্যা একেবারে কম নয়। এরপর মব ভায়লেন্সে মৃত্যুর যে নজির তৈরি হয়েছে, তা এখনো চলছে। সামাজিক শৃঙ্খলা এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। আন্দোলন একটি রাজনৈতিক পাঠশালা। এর অভিজ্ঞতা নানাভাবে প্রজন্মকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলে। কেমন করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, পাকিস্তানের সব অপপ্রচার ও নির্যাতন সত্ত্বেও স্বাধীনতার সংগ্রাম ধাপে ধাপে দানা বেঁধে পূর্ণতার দিকে ধাবিত হয়েছে, স্বাধীনতার পরও আশাভঙ্গ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে আর নতুন আশায় সংগ্রাম গড়ে উঠেছে। ইতিহাসের এই শিক্ষা সব মানুষ বই পড়ে  শেখেনি। এই ইতিহাস এক ধরনের রাজনৈতিক স্মৃতি, যা প্রবাহিত হয় জনতার মধ্যে এবং শিক্ষিত করে তোলে অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে। ফলে প্রতিটি আন্দোলনের মধ্যেই থাকে অতীত আন্দোলনে পূরণ না হওয়া দাবিগুলো। সাম্যের কথা বলে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কেন বৈষম্য সমাজের সর্বত্র? এই প্রশ্ন যেমন তাড়িত করে, তেমনি বিক্ষুব্ধ মানুষকে আন্দোলনেও নামিয়ে আনে বারবার। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও তার প্রভাব ছিল।

আন্দোলনের পর দেশ চলবে কোন পথে তা নিয়ে বিতর্ক স্বাভাবিক। অংশগ্রহণকারী সবার রাজনৈতিক মত ও পথ এক নয়। ফলে একটা সুস্থ বিতর্ক রাজনৈতিক সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। কিন্তু শুরুতেই যেসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক উপস্থিত করা হলো, তা আন্দোলনের দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সংবিধান কি ফ্যাসিবাদ জন্ম দিয়েছে, নাকি সংবিধান উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদী শাসন পরিচালিত হয়েছে? সংবিধানের দুর্বলতা দূর করার জন্য সংশোধন নাকি ছুড়ে ফেলে পুনর্লিখন, সংবিধানে বর্ণিত মূলনীতি বাতিল নাকি নতুন কোনো সংযোজন এসব বিতর্ক সমাধান হবে কোন পথে? আলোচনার টেবিলে যে সমাধান হবে না, তা স্পষ্ট। ফলে নির্বাচনের পর সংসদে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জুলাই সনদের ভিত্তি কী হতে পারে?  বৈষম্য বিলোপের আকুতি আর গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষায় মানুষ পথে নেমেছিল। ফলে এই দুই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী পথ রচনা করাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তনের যে কৌশলী চাপ প্রয়োগ, তা বিতর্ককে বিভক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আন্দোলনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগে এবং সেটা মানুষ মেনেও নেয়। কিন্তু আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কাজ যদি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নামে হতে থাকে, তাহলে শুধু হতাশা নয় এক ধরনের বিষাদ নেমে আসে জনগণের মধ্যে। একদিকে মব সৃষ্টি করে, কাউকে ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগ লাগিয়ে আক্রমণ করা, অন্যদিকে চাঁদাবাজির ব্যাপকতা মানুষকে হতাশ ও ভীত করে তুলছে। গত পনেরো বছর রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করতে ট্যাগ লাগানো, মামলা দেওয়া, পুলিশি নির্যাতন মানুষ দেখেছে। এখন যদি সেই প্রক্রিয়াই চলে, তাহলে পরিবর্তন হলো কোথায় এই প্রশ্ন উঠছে। চাঁদাবাজির ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা মানুষকে আতঙ্কিত ও বেদনাহত করছে। যে যুবকরা দেশের ভবিষ্যৎ, তারা জাতির সামনে কী দৃষ্টান্ত তৈরি করছে? দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছাত্র বলে এলাকাবাসী ও আত্মীয়স্বজনের সহায়তা নিয়ে যারা পড়াশোনা করেছে, তাদের গাড়ি বাড়ি জৌলুসপূর্ণ জীবনযাত্রা এবং দাপট মানুষকে ভাবিয়েছে। যারা নির্যাতনকে ভয় পেল না তারা টাকার হাতছানির কাছে হেরে গেল এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষ কষ্টের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছে।

চাঁদাবাজির অভিযোগ তো ছিলই। এটার দুঃখজনক প্রমাণ হাজির হচ্ছে, প্রায় প্রতিদিন। সম্প্রতি আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্যের বাসায় গিয়ে চাঁদা নেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতার নাখালপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার চারটি চেক উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জানা গেছে, ওই সোয়া দুই কোটি টাকার চেক নেওয়া হয়েছিল  রংপুর-৬ আসনে (পীরগঞ্জ) আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘ট্রেড জোন’ থেকে। ট্রেড জোনের পোশাক কারখানাসহ নানা ব্যবসা রয়েছে। এদিকে ট্রেড জোনের ব্যবস্থাপক বলেছেন, সোয়া দুই কোটি নয়, মোট ৫ কোটি টাকার ১১টি চেক নিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা আবদুর রাজ্জাকসহ ছয়জন। তবে একটি চেকের বিপরীতেও তারা টাকা উত্তোলন করতে পারেননি। টাকা উত্তোলন করতে না পেরে রাজ্জাকসহ অন্যরা ট্রেড জোনের মালিককে হুমকি দিচ্ছিলেন। এর আগে সাবেক সাংসদের স্বামীর কাছ থেকে প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা নেওয়ার পর দ্বিতীয়বার টাকা নিতে গিয়ে ১৭ জুলাই হাতেনাতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন আবদুর রাজ্জাকসহ পাঁচজন। বাকি চারজন হলেন ইব্রাহিম হোসেন ওরফে মুন্না, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও অপ্রাপ্তবয়স্ক একজন। এই ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় বাদে অন্য সব কমিটি স্থগিত করা হয়েছে।

চেক উদ্ধারের ঘটনায় জানা গেছে, ট্রেড জোনের মালিকের কাছ থেকেই পাঁচ কোটি টাকার চেক নেন রাজ্জাকসহ  ছয়জন। ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে তারা জানান, সম্প্রতি তাদের প্রতিষ্ঠান একটি জমি বিক্রির উদ্যোগ নেয়। সম্ভবত ওই জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারী এক ব্যক্তি আবদুর রাজ্জাকদের এই খবরটা দেন। আবদুর রাজ্জাকসহ ছয়জন গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় ট্রেড জোনের গ্রিন রোডের কার্যালয়ে গিয়ে জোর করে সবার ফোন কেড়ে নিয়ে বলেন যে, ভবনের নিচে শ-দুয়েক লোক উপস্থিত রয়েছে। চাঁদা দাবিকারীরা  শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি নিয়ে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে ভুক্তভোগীরা বলেন, ‘ওরা ওই ছবি পাশে রেখে প্রতিষ্ঠান মালিকের ছবি তুলে এবং জুতার মালা পরানোর হুমকি দিয়ে নগদ টাকা চায়। যদিও তারা অফিসে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি করে নগদ টাকা পায়নি। এরপর চেক বই বের করে জোর করে ১১টি চেকে ৫ কোটি টাকা লিখে স্বাক্ষর নিয়ে নেয়।’ তার অর্থ চাঁদা আদায়ের কি বিরাট জাল পাতা আছে। গুলশানে চাঁদাবাজির বিষয়ে ফেসবুকে  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র লিখেছেন, ‘ঠিকমতো খোঁজ নিলে বুঝবেন, এদের শিকড় অনেক গভীরে।’ এসব দেখে বিষন্নতা গ্রাস করছে পরিবর্তনকামী মানুষদের। একদিকে তীব্র বিতর্ক রাষ্ট্রের মূলনীতি নিয়ে, অন্যদিকে মূল্যবোধের কী নিদারুণ অবক্ষয়! প্রশ্ন উঠতে পারে, ফ্যাসিস্টের দোসর বলে কাউকে আখ্যা দিলে তার সম্পত্তি দখল করা যাবে এই মানসিকতার জন্ম হলো কেন? তার অপরাধের জন্য বিচার হবে। যে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার জন্য এত রক্তদান, জুতার মালা পরানো, চাঁদা নেওয়া এমনকি মেরে ফেলার মধ্য দিয়ে সেই রক্তের কি অপমান করা হয় না? জনগণের সংগ্রামকে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সুবিধার জন্য ব্যবহার করলে, জনগণ প্রতারিত বোধ করতেই পারেন। জুলাই ঘোষণার আড়ালে অনেক বিতর্ক যেমন চাপা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে, তেমনি সন্দেহ আছে নির্বাচন নিয়ে। নতুন একটি রাজনৈতিক দল নতুন বন্দোবস্তের স্লোগান দিয়ে, সেই পুরনো পথেই কি হাঁটছে? বিভিন্ন বিষয় শুধু বিষাদ নয়, বিপন্নতারও জন্ম দিচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক।

লেখক:  রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com