অনিয়ম অসংগতি বিশৃঙ্খলা দুর্ভোগ

চলার পথে কত অসংগতি আর বিশৃঙ্খলার দৃশ্য চোখে পড়ে, তার হিসাব রাখাও কষ্টকর। ঘর থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তায় পা ফেলতেই, চোখ-কান রাখতে হয় হুঁশিয়ার। দেখা যাবে, রাস্তা জুড়ে লেগে আছে জট। পথচারী হয়তো চলছে কোনো রকম। কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে কোনো বাহনে ভাড়ার বিষয়ে কথা বলছে। এরই মধ্যে দ্রুতগতিতে সেই পথচারীর নাকের কাছ ঘেঁষে পেরিয়ে গেল একটি মিনি অথবা বড় যাত্রীবাহী বাস। মনে মনে পথচারী ‘ইন্নালিল্লাহ’ বলে হাঁফ ছাড়ল। অথবা চোখের পলক ফেলার আগেই পরপর পাঁচটি মোটরসাইকেল পথচারীকে তার পায়ের ইঞ্চি দূরত্বে কাটিয়ে চলে গেল ওই জটের ঘোরালো প্যাঁচালো অবস্থান থেকে কিছু দূরের সামান্য খালি জায়গায়। দিনের তখন ১০টা হোক আর রাতের ৮টা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ হয়তো নেই অথবা ধারেকাছে থাকলেও রয়েছে লোকের দৃষ্টির আড়ালে। এমন যানবাহন জটলা চলছে হয়তো সকাল ৯টা থেকেই। সড়কে যখন এমন বিশৃঙ্খল দৃশ্য, তখন ওই সড়কের পাশেই খোলা আবর্জনার স্তূপ থেকে বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মোটরকারে বিরক্তিভরে বসে আছে তাদের ওই দুর্গন্ধে ভুগতে না হলেও যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস, রিকশা, অটো, সিএনজিচালিত বেবিট্যাক্সি চালক এবং যাত্রী আর পথচারীদের জন্য এ যেন নিত্যদিনের এক স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।

পাকা রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলুক বেচারা পথচারী ত্রস্তব্যস্ত অথবা ধীর কদমে। কিছুটা দূর যেতে না যেতেই তাকে হঠাৎ দেখতে হবে, সে আর রাস্তার কিনার ধরে হাঁটতে পারছে না। একের পর এক খুপরি টং দোকানে রাস্তার কিনারা বা পায়ে চলার পথ অথবা বাঁধানো ফুটপাত একেবারেই বেদখল। আবার কিছুটা পথ কোনোরকমে চলতি গাড়ির বা রিকশা, মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল পাশ কাটিয়ে যদিও বা এগুলো পথচারী, তখনই সামনে পড়ল ছোট ডোবা আকৃতির গর্ত যেখানে বাঁধানো ফুটপাত অদৃশ্য। কবে কোন ভর-বর্ষণ দিনে কিংবা রাতে পানির চাপে ওই ফুটপাত তলিয়ে বড়সড় এক গর্তে পরিণত হয়েছে, তা জানে না ওই পথচারী। জানে না রাস্তার নির্মাণ ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ। আর কে ওই কর্তৃপক্ষ? শহরে-নগরে ওই কর্তৃপক্ষের নাম যদি হয় সিটি করপোরেশন, কোনো জেলা-উপজেলায় তা পৌরসভা আর দেশ জুড়ে বিস্তৃত সড়ক ক্ষেত্রে সেই কর্তৃপক্ষের অবস্থান অনেক ওপরে, যার পরিচিতি জানাতে বলতে হয়, সড়ক-সেতু মন্ত্রণালয়। এতক্ষণ যত অসংগতি-বিশৃঙ্খলা-সমস্যা-দুর্ভোগের সামান্য বর্ণনা দেওয়া গেল, তার সঙ্গে সিটি করপোরেশন পৌরসভা বিষয়গুলোর উল্লেখে সামনে এসে দাঁড়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নাম। আবার ফুটপাতে যখন পথচারী তার পায়ে হাঁটার অধিকার বঞ্চিত, যখন নানা স্থানে ওই ফুটপাত বেদখল, যানবাহনের জটলায় যখন নগরীর সড়কে বেহাল দৃশ্য তখন আসে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন। আসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম। 

নৈমিত্তিক এমন দুর্ভোগে যাতনায় পথ চলতে হয় নগরবাসীকে। বাসগৃহে অবস্থানেও কত ঝক্কিঝামেলা তারও একটু উল্লেখ এখানে করা যাক। সকালে কিংবা দুপুরে-রাতে চুলা জ্বালাতে গিয়ে দেখা গেল, জ্বলছে না চুলা। বুঝা গেল, গ্যাস নেই। লাইনের গ্যাস রয়েছে যেসব মহল্লায় পুরনো দিনের বাসাবাড়িতে, এ সমস্যা সেখানে দেখা দেয় প্রায় প্রতিদিন। যখন রান্নার সময়, তখন গ্যাস নেই। তাই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে কী আর করা! মাঝরাতে চুলা জ্বালিয়ে রান্না শেষ করতে হয় গৃহী নগরবাসীকে। এখানে আসবে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নাম। এবার যদি চিকিৎসার কথা তুলি, হাসপাতালে লাইন ধরে টিকিট সংগ্রহ করে ডাক্তারের সামনে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গ আসে। দেখা যাবে, ডাক্তার সাহেব পর পর রোগী দেখে হয়রান। তিনি কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছেন। হঠাৎ দুপুর ১টা বেজে গেছে। ডাক্তার চলে গেছেন দুপুরের খাবারের জন্য। পরদিন যেতে হবে রোগীকে। স্কুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তিতে নগরবাসীর পেরেশানির তো অন্ত নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ থাক। ওপর ক্লাসের শিক্ষার্থী নিয়ে নগরবাসীর ভাবনার এবং ভাবনা নিরসনের রয়েছে রকমফের। সচ্ছল যারা তাদের ভাবনার সমাধান এক রকম। আর অর্থের টানাটানিতে যারা, তাদের ভাবনা শিক্ষার্থীর যোগ্যতার ওপর। এখানেও রয়েছে নানা অসংগতি। সরকারি কলেজ-ভার্সিটিতে ভর্তি ক্ষেত্রে অনিয়মের নানা সংলাপ চালু রয়েছে সমাজে। এসে যায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুই মন্ত্রণালয়ের নাম। এভাবে আলোচনা বাড়ালে কত অনিয়ম, কত অনাসৃষ্টির দৃশ্য চোখের সামনে দাঁড়াবে তার লেখাজোখা নেই। দিন-মাস-বছর-যুগ অতিবাহিত হয়ে চলেছে। অনিয়ম-অনাসৃষ্টির অবসান হলো না। কবে এমন অসংগতি-বিশৃঙ্খলার ধারা থেকে সমাজের উত্তরণ ঘটবে, তারও কোনো নিশ্চিত সূচি আমাদের সামনে নেই। আক্ষেপ নিয়েই বলতে হয়, চলুক এভাবে যত দিন চলে!