গ্রাহাম থর্পের জীবনের পরিণতি যেমন বেদনাদায়ক, তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ার তেমনি ছিল এক আশা ও সংগ্রামের মহাকাব্য। একশো টেস্ট আর ১৬টি সেঞ্চুরি তাঁর অর্জনের তালিকায় থাকলেও, থর্পের প্রকৃত পরিচয় ছিল তাঁর অনবদ্য মানবিকতা ও নিখাদ সততায়। তাঁর ব্যাটিংয়ে ফুটে উঠত তাঁর আবেগ; কখনো দৃঢ় প্রতিরোধ, কখনো অশ্রু-স্নাত ক্লান্তি।
১৯৯৩ সালে ট্রেন্টব্রিজে আবির্ভাবেই থর্প বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ভিন্ন ধাঁচের খেলোয়াড়। প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত ১১৪ রানের ইনিংস খেলেন। সেই ম্যাচে তাঁর সঙ্গী ছিলেন নাসের হুসেইন, ভবিষ্যতের ইংল্যান্ড ক্রিকেটের স্তম্ভ। এখান থেকেই শুরু হয় থর্পের এক অবিস্মরণীয় যাত্রা।
তবে এ গল্প শুধু সাফল্যের নয়, ব্যর্থতা ও অবমূল্যায়নেরও। রে ইলিংওয়ার্থের অধীনে থর্পকে মাঝেমধ্যে হেয় করা হতো, তাঁর আত্মত্যাগকে দুর্বলতা মনে করা হতো। অথচ ক্যারিবিয়ান সফরে তাঁর ৮৬ ও ৮৪ রানের ইনিংসগুলো ইংল্যান্ডের দুটো সম্ভাব্য জয় এনে দিতে পারত। সেই পোর্ট-অফ-স্পেন টেস্টে ৪০/৮ স্কোরবোর্ডের দিকে তাঁর শূন্যদৃষ্টিতে চাওয়া যেন কালের দলিলে স্থায়ী হয়ে আছে—একজন লড়াইরত মানুষের চরম হতাশা।
কিন্তু থর্প হার মানেননি। পরের টেস্টেই (বার্বাডোজে) লড়াই করে দলকে জয় এনে দেন। এমনকি ১৯৯৪ সালের গ্রীষ্মে প্রথম চারটি টেস্টে বাদ পড়ার পর ফিরে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনটি ৭০+ রানের ইনিংস খেলে সিরিজ ঘুরিয়ে দেন। তাঁর খেলার ধরণ ছিল স্মার্ট, কার্যকর—প্রতি দুই বলে এক রান, ফাঁকা জায়গায় বল ঠেলে, স্ট্রাইক ঘুরিয়ে রাখা।
২০০০-০১ সালের পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সফরে ছিল থর্পের ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময়। লাহোরে একটি লড়াকু সেঞ্চুরি ও কলম্বোতে ১১৩*—চরম ক্লান্তির মধ্যে দিয়েও খেলে গেছেন। ৭৪ রান তাড়া করতে গিয়ে যখন ইংল্যান্ড ৭১/৬, তিনি তখনও ছিলেন অপরাজিত, ৩২ রানে।
থর্পের জীবনের ট্র্যাজেডি শুরু হয় যখন তাঁর ব্যক্তিজীবনে ভাঙন ধরে। ২০০২ সালে লর্ডস টেস্টে ৪ ও ১ রান করেন। এরপরই ঘোষণা দেন অনির্দিষ্টকালের বিরতির। এর ফলে তিনি ২০০২-০৩ অ্যাশেজ মিস করেন।
তবে ফিরে এসে ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওভালে সেঞ্চুরি করে বুঝিয়ে দেন—তিনি ফিরে এসেছেন। ২০০৪ সালে ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
২০০৫ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১০০তম টেস্ট খেলে থর্প আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান। কেভিন পিটারসেনের আবির্ভাবের সময় যেন নিজে জায়গা করে দিলেন ভবিষ্যৎকে। কোনো উন্মাদনা নয়, কোনো নাটক নয় — একেবারে চুপিসারে।
খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিলেও থর্প আবার ফিরে এসেছিলেন সারে ও ইংল্যান্ড দলের কোচ হিসেবে। জো রুটসহ একাধিক তরুণ ব্যাটারের মেন্টর ছিলেন তিনি। তাঁর কোচিংয়ে সততা, সংবেদনশীলতা আর অভিজ্ঞতার এক অসামান্য মিশেল ছিল। একবার নিজেই বলেছিলেন — "আমি একজন ব্যক্তি হিসেবেও বদলে গিয়েছি এই খেলাটার মধ্য দিয়ে।"
তাঁর মৃত্যু: এক অব্যক্ত ব্যথা
গ্রাহাম থর্প ২০১৮ সাল থেকে মারাত্মক মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন। ২০২২ সালে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাঁকে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই কেলেঙ্কারি তাঁর আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি ঘটে। একই বছর তিনি একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন, যেখানে তিনি মস্তিষ্কে আঘাত পান এবং দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁর মানসিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে।
স্ত্রী অ্যামান্ডা থর্প জানিয়েছিলেন, ২০২৩ সালের শেষদিকে আবারও তিনি আত্মহত্যার চিন্তায় আক্রান্ত হন এবং তাঁর আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পরিবার ও চিকিৎসকের সহায়তায় কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি স্থিতি ফিরেনি। ২০২৪ সালের জুনে তিনি শেষবারের মতো একজন মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসকরা তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি কার্যকর হওয়ার আগেই থর্প চিরতরে চলে গেলেন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু সারা ক্রিকেটবিশ্বকে শোকস্তব্ধ করে দেয়। প্রথমে বিষয়টি দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হলেও, তদন্তে পরে উঠে আসে, এটি ছিল পরিকল্পিত আত্মহত্যা।
থর্পের মৃত্যু শুধু একজন ক্রিকেটারকে হারানো নয়, বরং একজন সত্যিকারের মানুষকে হারানো, যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—
থর্প কখনো সুপারস্টার হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি, তিনি ছিলেন "সারভাইভার"। একটি এমন সময়ের প্রতিনিধি, যখন ইংল্যান্ড ক্রিকেট জিততে শিখছিল — ধীরে, ধাপে ধাপে। তাঁর কভার ড্রাইভ বা পুল শট যেমন ছিল নান্দনিক, তেমনি ছিল ঘাম ঝরানো সিঙ্গেল, কিংবা হাল না ছাড়ার মানসিকতা। নিজেই বলেছিলেন, "লড়াই করতে হয়, জিততে না পারলেও থেমে যাওয়া যায় না।"
আজ এই দিনে, যখন ওভালে চলছে টেস্ট ম্যাচ, মাঠে-মাঠে যখন তাঁর স্মরণে মাথায় বাঁধা সাদা ব্যান্ড, তখন বুঝি — থর্প কখনো চলে যাননি, তিনি আছেন আমাদের মনেই।
অ্যান্ড্রু মিলারের লেখা থেকে