জুলাই- আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে তৃতীয় কার্যদিবসে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। বুধবার ( ৬ আগস্ট) সাক্ষ্য দিয়েছেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী রীনা মুরমু।
বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজমুদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের ট্রাইব্যুনালে এ সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন তাদের জেরা করেন। সাক্ষী রীনা মুরমু বলেন, তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারিতে ছিলেন এবং আবু সাঈদ হত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। রীনা মুরমু তার জবানবন্দিতে আন্দোলনে তাদের ওপর পুলিশের নির্যাতন এবং ১৬ জুলাই বেরোবির সামনে আবু সাঈদকে কিভাবে গুলি করা হয় তার বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনার বিচারের আরজি জানান। শেখ হাসিনাসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে আবু সাঈদ হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
সাক্ষী রীনা মুরমু জবানবন্দিতে বলেন, “১৬ জুলাই তারা আন্দোলনের জন্য দুটি জায়গা নির্ধারণ করেন। একটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় গেট। ওই দিন সকাল ১০টার দিকে জেলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। আমি প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিই। মিছিল নিয়ে চারতলা মোড়ে যাই। পথে পথে পুলিশ বাধা দেয়। আমাদের সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়। পার্ক মোড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে (বর্তমানে শহীদ আবু সাঈদ গেট) যাই। সেখানে আগে থেকেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের লোকজন অবস্থান করছিল। আমরা কিছুক্ষন অবস্থান করে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেই। এসময় পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে অতর্কিতভাবে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। একপর্যায়ে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই এবং আমি কাছেই একটা খোলা চায়ের দোকানে গিয়ে আশ্রয় নেই। রীনা মুরমু বলেন, সে সময় আবু সাঈদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের কর্র্মীরা লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে আবু সাঈদ সড়কের ডিভাইডারের ওপাশে গিয়ে দাড়ায়। তার দুই হাত প্রসারিত অবস্থায় ছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট থেকে পুলিশ আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পরে ওই দুজন পুলিশের নাম আমি জানতে পারি।”
তিনি বলেন, “গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদকে সহযোদ্ধা আয়ান সড়ক থেকে উঠিয়ে পার্ক মোড়ের দিকে নিয়ে যায়। আবু সাঈদকে গুলি করার পর ওই স্থানটি ফাঁকা হয়ে যায়। আমি চায়ের দোকানের যে জায়গাটায় ছিলাম সেখান থেকে দুই পুলিশকে গুলি করদে দেখেছি। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে জানতে পারি আবু সাঈদ মারা গেছে। সাক্ষী রীনা মুরমু বলেন, আবু সাঈদ মারা গেছে। আমাদের অনেক সহযোদ্ধা আহত হয়েছে। আমি নিজেও আহত হয়েছি। ঘটনার সময় আমি নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। রাষ্ট্রক্ষমতায় যিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ছিলেন তিনি (শেখ হাসিনা) এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যারা গুলি করেছেন, ছাত্রলীগ তাদের বিচার করতে হবে।” জবানবন্দির পর সাক্ষী রীনা মুরমুকে জেরা করেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। এরপর মইনুল হকের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৭ আগস্ট দিন ধার্য করে।
এর আগে গত রবিবার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ওই দিন প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের পর সাক্ষ্য দেন গণআন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়িতে গুলিতে মুখাবয়ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খোকন চন্দ্র বর্মন। এরপর সোমবার জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে পা হারানো শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল ইমরান এবং যাত্রাবাড়িতে চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়া সাক্ষী পারভিন সাক্ষ্য দেন। এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচজন সাক্ষ্য সাক্ষ্য দিলেন। গত ১২ মে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর ১ জুন তিন আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ১৩টি ভলিউমে সাড়ে আট হাজার পৃষ্টার অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়।