বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর অতিবাহিত হলেও পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, ল্যাব এবং গ্রন্থাগারের তীব্র সংকটে ভুগছে দক্ষিণাঞ্চলের এই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আবাসন সংকট সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মোট শিক্ষার্থীর ৭৭ শতাংশই আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অভিযোগ রয়েছে, এই সংকটের সুযোগে স্থানীয় বাড়িওয়ালারা বরিশাল শহরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে। শিক্ষার্থীরা বাড়িওয়ালাদের কাছে জিম্মি হলেও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে মাত্র দুই হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। অর্থাৎ মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের আবাসন সুবিধা পাচ্ছে। এ ছাড়া, একটি ছোট কক্ষে আটজন শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আশপাশের এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগে স্থানীয় বাড়িওয়ালারা বরিশাল শহরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করছে। বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাটের গড় ভাড়া ৫ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা হলেও ক্যাম্পাস এলাকায় তা ৮-৯ হাজার টাকা।
শিক্ষার্থীদের মতে, এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতা এবং স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবৃত্তি দায়ী। প্রয়োজনীয় হল নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা, বাজেট সংকট এবং প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবকে তারা সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদক ৭-৮ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানান, একটি কক্ষের জন্য ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করা হয়, এর সঙ্গে যোগ হয় বিভিন্ন চার্জ। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে, যা অনেকের পক্ষে বহন করা কঠিন।
শেরে বাংলা হলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আরিফুল রহমান অনিক হল ছেড়ে বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এক মাস ধরে বাসা খুঁজেও তিনি শিক্ষার্থীবান্ধব কোনো বাড়িওয়ালা পাননি। তিনি বলেন, ‘হল ছেড়ে ক্যাম্পাস এলাকায় বাসা খুঁজেছিলাম। কিন্তু বাড়িওয়ালাদের অতিরিক্ত ভাড়া দাবির কারণে বাসা ভাড়া নিতে পারিনি।’
হল ত্যাগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের হলের অবস্থা খুবই করুণ। একটি কক্ষে আটজন থাকতে হয়, এমনকি একটি বেডে দুজনকে থাকতে হয়, যা আমার কাছে অস্বস্তিকর। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে পড়াশোনায় সমস্যা হয়।’
মল্লিকা হাউজের মালিক আবদুর রহমান হাওলাদারের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘নতুন নির্মিত বাড়ির ভাড়া স্বাভাবিকভাবেই বেশি। আমাদেরও বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।’
ক্যাম্পাস এলাকায় ভাড়া বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে বাড়ির সংখ্যা কম, চাহিদা বেশি। ব্যাচেলরদের ভাড়া দিলে বাড়ির নানা সমস্যা হয়। সব মিলিয়েই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়।’ রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আবাসন সংকটের সুযোগ নিচ্ছে কিছু বাড়িওয়ালা। ছাত্রীদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রশাসন যেহেতু আবাসন সুবিধা দিতে পারছে না, তাদের এ বিষয়ে ভূমিকা রাখা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা তাদের অবহেলা দেখেছি। আমরা এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক রাহাত হোসেন ফয়সাল বলেন, ‘বাসার ভাড়া নির্ধারণ করেন বাড়িওয়ালারা। আমাদের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে আমরা চাইলে তাদের অনুরোধ করতে পারি যেন শিক্ষার্থীদের অবস্থা ও সামর্থ্য বিবেচনা করেন। প্রয়োজনে আমরা বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব।’