খাগড়াছড়ির পাহাড়ি গ্রাম থেকে উঠে এসে এখন এশিয়ার মঞ্চে নিজেকে চিনিয়েছেন মনিকা চাকমা। বাংলাদেশ নারী দলের মাঝমাঠের অন্যতম অস্ত্র বর্তমানে খেলছেন ভুটান ওমেন্স লিগে পারো এফসির হয়ে। সেরা প্রস্তুতি নিয়ে এশিয়ান কাপে যাওয়ার কথা ভুটান থেকে শুনিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দকে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ফিফা র্যাংকিংয়ে ২৪ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ এখন ১০৪-এ অবস্থান করছে। অথচ তিন বছর আগেও আপনারা ছিলেন ১৪৭তম। তিন বছরে অভাবনীয় সব সাফল্য নিজেদের করে বাংলাদেশ এখন এশিয়ান কাপের এলিট মঞ্চে। নিশ্চয় খুব রোমাঞ্চিত?
মনিকা চাকমা : আমাদের এই উন্নতি কিন্তু স্রেফ তিন বছরের চেষ্টায় হয়নি। সেই ২০১৬ সাল থেকে একটা বড় সংখ্যার ফুটবলার এক সঙ্গে আছি, খেলছি। শুরু থেকেই আমরা অনেক অনেক পরিশ্রম করেছি, যা এখন বলে বোঝানো যাবে না। প্রতিদিন ভোরে উঠে রানিং করতাম, ঘাম ঝরাতাম। বিকেলেও মাঠে অনুশীলন করেছি বছরের পর বছর। এভাবেই ধাপে ধাপে নিজেদের উন্নতি করেছি।
যখন প্রথম বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ পেলেন তখনকার বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমানের বাংলাদেশের কী কী পরিবর্তন দেখেন?
মনিকা : পরিবর্তন তো হয়েছে অনেক। আগে পুরো ৯০ মিনিট এক ছন্দে খেলার সামর্থ্য আমাদের অনেকের ছিল না। এখন আমাদের সবারই সেই সামর্থ্য হয়েছে। এক লয়ে আমরা হাই প্রেসিং ফুটবল খেলছি। তাছাড়া বলের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ অত বেশি থাকত না। বল পেলেও লম্বা করে ফেলতাম প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে। এখন আমাদের পাসিং, ড্রিবলিং সামর্থ্য অনেক বেড়েছে। একে অপরের সঙ্গে বোঝাপড়া বেড়েছে। এখন ওয়ান-টু করে আমরা অনায়াসে আক্রমণে উঠতে পারি, আক্রমণ সাজিয়ে গোলের চেষ্টা করতে পারি। বল হারালে দ্রুত রক্ষণে নেমে খেলতে পারি। আবারও বলছি এসব স্রেফ দুই-তিন বছরে হয়নি। বছরের পর বছর চেষ্টার ফলেই হয়েছে।
এখন তো মেয়েদের ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে দেখা যায়-
মনিকা : ভয় থাকে না, বিষয়টা এমন না। ভয় তো অবশ্যই থাকে। এই যেমন এশিয়ান কাপে আমাদের চীন, উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেলতে হবে। তাদের সঙ্গে কেউ যদি বলে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলবে, সেটা মিথ্যে বলা হবে। এটা ঠিক আগের চেয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। তবে সেটা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে বলে দেব চীন, উত্তর কোরিয়ার মতো এশিয়ার সেরা দলগুলোকে হারাব। আমাদের লক্ষ্য থাকবে যত কম গোল খাওয়া যায় আর তাদের কাজ যতটা সম্ভব কঠিন করে তোলা যায়। কারণ তারাও কিন্তু চাইবে আমাদের বিপক্ষে বেশি বেশি গোল করতে।
তারপরও মিয়ানমার, বাহরাইনের মতো দলের বিপক্ষে আপনাদের দেখা গেছে প্রাধান্য বিস্তার করে খেলতে মনিকা : আগেই বলেছি আমাদের সামর্থ্য আগের চেয়ে অবশ্যই বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এখন আমরা আরও শক্তিশালী দলদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি। তবে দক্ষতা আরও বাড়ানোর বিকল্প নেই। যে পর্যায়ে আমরা পৌঁছেছি সেখান থেকে আরও অনেক উন্নতি আমাদের করতে হবে।
বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান?
মনিকা : অনেকেই আমাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখছে যে এবারই আমরা বিশ্বকাপে চলে যাব। আমি এভাবে চিন্তা করি না। এবারই আমরা প্রথম এশিয়ান কাপে খেলব। স্বপ্ন তো অবশ্যই আমাদের বহুদূর যাওয়া, বিশ্বকাপে খেলা। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ধীরে ধীরে এগুতে হবে। এবারই হয়ে যাবে, তা আমি বলতে চাই না। আমরা যেহেতু প্রথম খেলব, তাই চেষ্টা থাকা উচিত নিজেদের উন্নতির প্রমাণ রাখার।
আর ফুটবল ছাড়ার পর?
মনিকা : সারা জীবন তো খেলতে পারব না। এক সময় ছাড়তেই হবে। খেলা ছাড়ার পর আমার এলাকার পাহাড়ি বাচ্চাদের ফুটবল কোচিং করাতে চাই।
এশিয়ান কাপে আপনাদের গ্রুপে উজবেকিস্তানও আছে। তাদের নিশ্চয় হারাতে চাইবেন?
মনিকা : তারা যেহেতু নেপালকে খুব কষ্ট করে টাইব্রেকারে হারিয়েছে, তার মানে তাদের হারানোর মতো সামর্থ্য আমাদের আছে। আমরা জোর চেষ্টা করব সেই ম্যাচটি জেতার। তবে তার আগে এশিয়ান কাপের জন্য আমাদের সেরা প্রস্তুতি নিতে হবে।
সেরা প্রস্তুতি বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
মনিকা : ভালো ভালো দলের বিপক্ষে প্রচুর ম্যাচ খেলার বিকল্প নেই। এত বড় আসরে চীন, কোরিয়ার মতো প্রতিপক্ষ মোকাবিলার প্রস্তুতি হওয়া উচিত কমপক্ষে এক বছরের। সেই সময়টা আমাদের হাতে নেই। যতটুকু আছে, সেটাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। ভালো প্রস্তুতির জন্য খেলোয়াড়দের ভালো সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা জরুরি।
অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটা তো অনেকটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতোই ব্যাপার?
মনিকা : আমি প্রথম বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে আসি ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ দলে। তারও আগে বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলার সুবাদে ঢাকায় খেলার সুযোগ হয়েছিল। আমি বড় হয়েছি ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলে। তখন স্বপ্ন ছিল স্রেফ ফুটবলার হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে অনেক বাধা পেরিয়ে আসতে হয়েছে। এখন দেশের গণ্ডি ছড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়া এমনকি এশিয়ার অনেক মানুষ আমাদের চেনে। তবে এখানেই থেমে থাকার সুযোগ নেই। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন সারা দুনিয়ার মানুষ বাংলাদেশকে চিনবে আমাদের মাধ্যমে। সেটা করতে হলে সবার আগে ঘরোয়া ফুটবলকে একটা শক্ত ভিত্তি দিতে হবে। বলতে পারেন ঘরোয়া ফুটবল লিগ আমাদের জন্য বড় আক্ষেপের একটা অধ্যায়।
ভুটান ডাবল লিগ পদ্ধতিতে লম্বা লিগ আয়োজন করছে। বাংলাদেশ ছাড়াও সেই লিগে অন্য দেশের বিদেশিরাও খেলছে। তাদের লিগের সঙ্গে বাংলাদেশের লিগের পার্থক্য কতটা?
মনিকা : আমি তো মনে করি পার্থক্য অনেক। এখানে ১০ দল নিয়ে ছয় মাসের বেশি সময় নিয়ে লিগ হয়। পাঁচ থেকে ছয়টা ভালো মানের দল আছে। আমি যেই দলে খেলি সেই পারো এফসি’র সবকিছুতেই আছে পেশাদারিত্বের ছাপ। আমরা এখানে রিসোর্টে থাকি, খাওয়া-দাওয়া, ট্রেনিংয়ের মানও অনেক উঁচু। নিয়মিত বেতনও পাচ্ছি। বাংলাদেশে তো সে রকম হয় না। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে লিগ শেষ হয়। ভালো মানের দল হয় বড়জোর দুটো। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সুযোগ-সুবিধা ভুটানের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশে যদি ভালো মানের লিগ হতো, তাহলে তো দল বেঁধে বাংলাদেশি ফুটবলারদের এখানে এসে খেলতে হতো না। আমি মনে করি একটা ভালো মানের লিগ হওয়া ভীষণ জরুরি। এতে ভালো ভালো ফুটবলার যত উঠে আসবে, আমরাও একটা আর্থিক নিরাপত্তা পাব। তাছাড়া ভালো লিগ না হলে যারা জাতীয় দল থেকে ছিটকে গেছে, তাদেরও তো ফেরার সুযোগ থাকে না।
আপনি কি সিনিয়রদের কথা বলছেন?
মনিকা : আমি চাই সিনিয়র আপু যারা এখন জাতীয় দলের বাইরে, তারা নিজেদের প্রমাণের একটা সুযোগ পায়। আমি চাই আপুরা পারফর্ম করুক, দেখিয়ে দিক তারা ফুরিয়ে যাননি। জাতীয় দলে সিনিয়র আপুদের ফেরার অপেক্ষায় আছি। এশিয়ান কাপের মতো আসরে আমি মনে করি তাদের এখনো প্রয়োজন আছে। তাদের জন্য হলেও দেশে একটা ভালো মানের লিগ হওয়া জরুরি।
দশ বছরে দেশকে অনেক কিছু দিয়েছেন। রাষ্ট্র আপনাদের দিয়েছে অনেক কিছু। তারপরও কিছু কিছু অপ্রাপ্তি থেকেই যায়। আপনাদের অভিভাবক বাফুফের কাছে কি কিছু চাওয়ার আছে?
মনিকা : তারা আমাদের অভিভাবক। তাই তাদের কাছে তেমন কিছু চাওয়ার নেই। দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসি, তারাও আমাদের ভালোবাসে বলেই ফুটবল খেলি। শুধু চাই আমাদের বেতন-বোনাসটা যাতে নিয়মিত হয়।