রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকল ধরনের রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বেরোবি প্রশাসন। তবে ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে প্রকাশ্যে নিয়মিতই চলছে একাধিক রাজনৈতিক সংগঠনের মিছিল মিটিং, শোডাউন, ফরম পূরণ কর্মসূচিসহ দলীয় নানা কার্যক্রম।
গত বছরের ১১ আগস্ট প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার মো. আলমগীর চৌধুরী প্রাথমিকভাবে এক অফিস আদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
পরে ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ ভিসি হিসেবে নিযুক্ত হন প্রফেসর ড. শওকাত আলি। তিনি এসে ২৮ অক্টোবর ১০৮তম সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলের সব ধরনের রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। যা পরে প্রায় ৬ মাস পর ১৩ এপ্রিল ২০২৫ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১১তম সিন্ডিকেটে এ সংক্রান্ত বিধিমালা অনুমোদন পায়।
গত ১৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অফিস আদেশে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আবাসিক হলের সিট বাণিজ্য, সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং লেজুড় বৃত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণিত হলে 'সর্বোচ্চ শাস্তি আজীবন বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল' এবং প্রয়োজনে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শান্তি বিধানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এ আদেশের পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল, শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী, শিবিরের নেতাকর্মীরা এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কয়েকজন বিভিন্নভাবে লেখালেখি ও প্রতিবাদ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অপরাজনীতি আমরা দেখে এসেছি। তারা কিভাবে সবাইকে জোরজবরদস্তি করেছে, বিপক্ষকে হামলা করেছে। যারা আবু সাঈদকে পুলিশের সাথে মিলে হামলা করে মেরে ফেলেছে। এই রাজনীতির কারণেই তো আমরা আবু সাঈদকে আমাদের ক্যাম্পাসের সামনেই হারিয়ে ফেলেছি। আর কোনো রক্ত দেখতে চাইনা, ক্যাম্পাসে কোন রাজনীতিও চাইনা।
এদিকে দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে না পারা ও দফায় দফায় ছাত্রলীগের কাছে হামলার শিকার হওয়া ছাত্রদল নেতাকর্মীরা নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। আবার ছাত্রলীগের নিপীড়নের শিকার হওয়া ইসলামি ছাত্রশিবিরও দীর্ঘদিন পর আত্মপ্রকাশ করেছে। সর্বপ্রথম গত ২৭ নভেম্বর ইস্কন বিরোধী মিছিলে আত্মপ্রকাশ করেন বেরোবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানা। এছাড়াও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বেরোবি সভাপতি রিনা মুরমুসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, চাওয়া ও অধিকার বিভিন্নভাবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন দীর্ঘদিন থেকে।
তবে প্রশাসনের আদেশ আসলে তারা সঠিকভাবে ব্যানারে কার্যক্রম চালাতে পারছিল না। তাই অনেকটা ব্যানার ছেড়েই বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে নানা ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছিল। তবে ছাত্রলীগের শাস্তির বিষয়ে, সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে, ধর্ষণের শাস্তি চেয়ে, বিক্ষোভ মিছিল, ভর্তি সাহায্য কেন্দ্রে, দলীয় ফরম বিতরণসহ একাধিক কার্যক্রমে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ও গেইটের আশেপাশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। তারা জানায়, দীর্ঘ একযুগ ধরে ক্যাম্পাসে সঠিকভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে পারিনি, ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের লীগার শিক্ষক ও প্রশাসন সবসময় আমাদের বাধা দিয়েছে। বর্তমানে তাদেরই এজেন্ডা আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চাকে বন্ধ রাখা।
তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, কোনভাবেই ক্যাম্পাসে লেজুরবৃত্তিক রাজনীতির চর্চা চলবে না বরং ছাত্র সংদের রাজনীতি চলবে এবং প্রশাসনের আদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’
তাদের এসব দাবি ও উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, শিবির নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে ।বাম রাজনীতির সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টও মাঠের রাজনীতিতে সেভাবে সক্রিয় না হলেও ভিন্নভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম করে আসছে।
এদিকে সাবেক সমন্বয়কদের যারা ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধের আন্দোলন করে আসছিলেন তাদের নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। বর্তমানে অনেক নেতা তো এনসিপির পক্ষে কাজ করে আসছে এবং তাদের ম্যান্ডেট পূরণ করছে। তাছাড়া অনেকেই আবার বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ এর রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় নেতা।
গত বছরের ৭ নভেম্বর ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের পর সর্বপ্রথম ছাত্রদল জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের পোস্টার লাগায় ক্যাম্পাসজুডে। ৫ জানুয়ারি ক্যাম্পাসে প্রদক্ষিণ ও দলীয় শোডাউন করে ছাত্রদল। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারিতে মার্চ ফর জাস্টিস ও ৮ দফা নিয়ে মিছিল করে তারা। ১১ মার্চে ধর্ষনের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবিতে ছাত্রদল মিছিল করে, ১৮ মে সাম্য হত্যার বিচারে বিক্ষোভ ও মিছিল, ১১ জুলাই খুলনা ও মিডফোর্ডের হত্যাকান্ডের বিচারে দাবিতে মিছিল, ১৬ জুলাই রাতে ক্যাম্পাসের দেয়ালে রাতে ছাত্রলীগ জয় বাংলা লিখে যার প্রতিবাদে ১৭ জুলাই মিছিল ও প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দেয় ছাত্রদল, ১৮ জুলাই প্রক্টরকে সাথে নিয়ে খেলাধুলা উদ্বোধন করে, ১৯ জুলাই শহীদদের স্মরণে ক্যাম্পাসের মসজিদে দোয়া মাহফিল, ২০ জুলাই সদস্য সংগ্রহের ফর্ম বিতরণ ও প্রশাসনকে সমন্বয়করা শাড়ী চুড়ী দিলে তার প্রতিবাদে মিছিল করে ছাত্রদল।
এদিকে ক্যাম্পাস জুড়ে ছাত্রদলের নানা কার্যক্রম ও গেটের পাশে কেন্দ্রীয় নেতাসহ ফরম বিতরণ কর্মসূচি পালন করলে বিক্ষোভ ও নানা সমালোচনা করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাবেক সমন্বয়কেরা।
এদিকে এর জবাবে বাংলাদেশ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মোল্লাহ মো. মুসা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, “ যতই মীম বানাও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের কমিটি হবেই ইনশাআল্লাহ।’’
এ নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয় এবং রাজনীতি নিষিদ্ধ চাওয়া শিক্ষার্থী বলেন, এটা একপ্রকার জোরপূর্বক পেশি শক্তি প্রদর্শনীর লক্ষণ। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে তাদের কমিটি দেয়া নিয়ে এমন বক্তব্য নিন্দনীয়।’
ক্যাম্পাসে রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব রাশেদ মন্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, “ক্যাম্পাসে সবাই রাজনীতি করবে। কেউ ভুল করলে সমালোচনা করবে আবার ভালো করলে প্রশংসা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যারা রানিং তারা ক্যাম্পসে রাজনীতি করবে এটাই স্বাভাবিক।”
আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ কিংবা প্রকাশ্য রাজনীতি করতে বাধার সম্মুখীন থাকায় নিজেদের রাজনৈতিক কার্যক্রম গোপনেই পালন করতেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। নানা সময়ে তাদের শনাক্ত করে বা সন্দেহ করেও আটক করা হয়েছিল বলে জানায় নেতাকর্মীরা। তবে গত ২৭ নভেম্বর ইস্কন বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসেন বেরোবি শাখা শিবিরের তৎকালীন সভাপতি সোহেল রানা। এরপর ১০ ডিসেম্বর ক্যাম্পাসের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন শিবির নেতাকর্মীরা।
১২ আগস্টের পর ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধের আদেশ থাকলেও গত ৭ মাসেই শিবিরের বেরোবি শাখার কমিটি প্রকাশ পেয়েছে ২ বার। গত ৭ জানুয়ারি ও ৯ জুলাই ২০২৫ সভাপতি ও সেক্রেটারি প্রকাশ্যে এনে এ ঘোষণা দেয়া হয়। ৪ মার্চ ক্যাম্পাসের প্রধান গেইট সংলগ্ন আবু সাঈদ মসজিদে ওযুখানা তৈরি করে দেয় শিবির। এছাড়াও আবু সাঈদ চত্বরে তাদের ফরম বিতরণ কর্মসূচি পালন করে। তাছাড়া ছাত্রসংসদ চেয়ে বেশ কয়েকবার বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে এসেছে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মী।
ছাত্রশিবিরের সভাপতি সুমন সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, “রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও সবাই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সাথেই আছেন। ছাত্ররা পড়াশোনার সময় বিভিন্ন দাবি দাওয়া থাকে প্রশাসনের কাছে, এগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জানাতে পারলে হবে কিন্তু সেটা না পারলে কিভাবে হবে? তাহলে এটার জন্য প্রয়োজন ছাত্রসংসদ।’
আবার ৫ আগস্টের পর থেকে সমন্বয়কদের সাথে একত্র হয়ে বেশ কিছু দাবি,দাওয়া ও কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা করেন ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ বেরোবির সাথে বাজেট বৈষ্যম্য নিরসনের দাবিতে আন্দোলনের অন্যতম লিডার ছিলেন শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি রিনা মুরমু। ক্যাম্পাস রাজনীতি নিয়ে রিনা মুরমু দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিটি ক্যাম্পাসে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চাটা থাকা দরকার। ক্যাম্পাসে আমরা দীর্ঘদিন যে দখলদারিত্বমূলক রাজনীতিটা দেখেছি সেটা দূর করতে হবে এবং যে রাজনীতির মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়াগুলো পূরণ হবে সেইটা থাকা দরকার এবং ছাত্রসংসদ হওয়া দরকার। ছাত্রফ্রন্ট দীর্ঘদিন থেকেই ক্যাম্পাদে ছাত্রসংসদ প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছি।’
এদিকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চাওয়া সাবেক সমন্বয়কদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিভিন্ন দলীয় নেতাকর্মী বলেন, কেউই রাজনীতির বাইরে না। ছাত্রসংসদহীন ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ চাওয়াও একটি রাজনীতির অংশ। তাছাড়া বহু সমন্বয়ক এখন এনসিপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে যা দৃশ্যমান। আবার অনেকে বাগছাসের কমিটির নেতৃত্বে রয়েছে। কিছুদিন আগে এনসিপির প্রোগ্রামে ক্যাম্পাসের রাজনীতি নিষিদ্ধ চাওয়া নেতাকর্মীরাও অংশ নিয়েছে।
ক্যাম্পাসে চলমান রাজনৈতিক কার্যক্রম, সমন্বয়কদের ভূমিকা ও ক্যাম্পাসে বন্ধ চেয়ে বাইরে রাজনীতি করা প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সাবেক সমন্বয়ক এস এম আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, “২৪ পরবর্তী আবু সাঈদের ক্যাম্পাসে কোনো দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম আমি চাইনা হোক সে ছাত্রদল, শিবির, এনসিপি, বাগছাস কিংবা ছাত্রফ্রন্ট। তাই বলে এমন না যে আমি যদি রাজনৈতিক দলে মতাদর্শের হই সেই দলকে প্রশ্রয় দিব। প্রত্যেক ব্যক্তির তার মতাদর্শে দল থাকতেই পারে সেটা সে ক্যাম্পাসের ৭৫ একরের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করুক কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে এই রাজনীতির প্রশ্রয় আমি চাইনা সেটা যেকোনও দলই হোক।”
এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিমুক্ত, কেউ যদি করে,কেউ যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আমরা তাদের সাথে কথা বলি। তাদেরকে কারণ দর্শনো এবং যদি সেরকম হয় কমিটি করে দেই এবং রিপোর্ট দেয়। ক্যাম্পাসে অলরেডি প্লাকার্ডও বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়েছি যে ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ। কেউ এসব ভায়োলেট করলে শোকজ করে কমিটি করে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।”