বিনিয়োগের রাজনীতি বনাম জনসেবার নৈতিকতা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি রাজনৈতিক দর্শনের নাম হচ্ছে, ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা’ বা পলিটিক্যাল ক্লায়েন্টালিজিম (Political Clientelism), যেটা এমন এক ব্যবস্থা যেখানে রাজনৈতিক নেতা ভোট পাওয়ার জন্য সরাসরি অর্থ বা সুবিধা প্রদান করেন এবং নির্বাচিত হয়ে সেই বিনিয়োগ ফেরত আনেন। লাতিন আমেরিকার খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিয়ারমো ও’ডনেল (Guillermo, Donnell) মনে করেন ‘ক্লায়েন্টেলিজম রাজনীতিকে এক বাজারে রূপান্তর করে, যেখানে ভোট কেনাবেচা হয়, আর জনপ্রতিনিধিত্ব পরিণত হয় বিনিয়োগ থেকে মুনাফা তোলার যন্ত্রে।’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদ সদস্য হওয়ার আকাক্সক্ষা অনেকটাই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দখলের শুরুর ধাপ। একজন এমপি প্রার্থীকে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই এলাকায় সক্রিয় হতে হয়। বিশেষ করে ‘ক্ষমতাসীন’ বা ক্ষমতায় আসার সমূহ সম্ভাবনাময় দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জন্য প্রচার-প্রচারণা, জনসংযোগ, অনুদান বিতরণ, ইফতার, বিয়ের দাওয়াতে উপস্থিতি, সমাজসেবামূলক কার্যক্রমসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতার মতো কর্মকান্ডে নিয়মিত অংশ নেওয়া এখন বলতে গেলে, বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি এসব ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথি হওয়া নিয়ে, মনোনয়ন প্রত্যাশী একাধিক প্রার্থীর ভেতরে রেষারেষি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে, দাঙ্গা-হাঙ্গামার দৃশ্যও চোখে পড়ে।

গত বছর আগস্টে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রকারান্তরে ভোটবিহীন বাংলাদেশে মানুষ আবার ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে। আর প্রার্থীরা মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের সঁপে দিচ্ছেন জনগণের মধ্যে। কিন্তু এই পথ মোটেই সহজ নয় বড়ই কণ্টকাকীর্ণ, বিশেষ করে সৎ এবং যোগ্য প্রার্থীদের বেলায়। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, আগামী ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে সংঘটিত হবে। সেই হিসেবে ২৪-এর আগস্ট থেকে শুরু করে প্রায় দেড় বছর একজন প্রার্থীকে অনবরত মাঠে থাকতে হচ্ছে। একজন এমপি প্রার্থীর অন্তত মনোনয়নপ্রাপ্তির জন্য ব্যয় নির্ভর করে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর : (১) এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তৃতি ও জনসংখ্যা, (২) প্রার্থীর দলীয় পরিচয় বা কোন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং (৩) প্রচারণার ধরন (সামাজিক কর্মকা-, দান, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি)। বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে, বিভাগীয় শহরের বাইরে একজন প্রার্থীর এক বছরের প্রচার-প্রচারণা চালাতে খরচের একটা আনুমানিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি, যা দিয়ে পুরো সময়ের খরচের একটি আনুমানিক ধারণা পাওয়া যাবে।

দলীয় বা ব্যক্তিগত অফিস ভাড়া, কর্মচারী বাবদ : ৮-১২ লাখ টাকা; পোস্টার, ব্যানার, প্রিন্ট মিডিয়া : ৮-১২ লাখ টাকা; ফেসবুক ও ডিজিটাল মিডিয়া প্রচার : ১-৩ লাখ টাকা; ইফতার মাহফিল : ৪০-৫০ লাখ টাকা; দান ও অনুদান ২০-৩০ লাখ টাকা; দলীয় দিবস এবং কেন্দ্র ঘোষিত প্রোগ্রামগুলো উদযাপন বাবদ : ১৫-২০ লাখ টাকা; ধর্মীয়, সামাজিক, অনুষ্ঠান স্পন্সর : ১০-১৫ লাখ টাকা; যানবাহন, তেল, যাতায়াত বাবদ ৫-৭ লাখ টাকা; চা-নাস্তা ও জনসংযোগ খরচ : ৫-৭ লাখ টাকা; অন্যান্য খরচ : ১০-২০ লাখ টাকা। সর্বসাকুল্যে প্রতি বছরে আনুমানিক ব্যয়  দাঁড়াচ্ছে ১ থেকে ১.৫ কোটি টাকা, মানে মাসে ব্যয় ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা। এলাকার একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই আপনার প্রার্থীর মাসিক উপার্জনের আনুমানিক তথ্য জানেন। কিন্তু আপনি কখনো কি আপনার প্রার্থীকে প্রশ্ন করেছেন, তিনি কীভাবে মাসে ১০ লাখ টাকা খরচ করেন?

এই অর্থের উৎস কোথায়? : সৎ ও স্বচ্ছ আয় থেকে এই বিপুল ব্যয় বহন করা একজন সাধারণ নাগরিক বা রাজনৈতিক নেতার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এখানেই আসে প্রশ্ন, এ টাকার উৎস কী? দুর্নীতিবাজ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই অর্থ মূলত আসে, নিম্নোক্ত কয়েকটি উৎস থেকে

১। ঠিকাদারি ও কমিশন বাণিজ্য : অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি দপ্তর কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে থেকে কমিশন বাণিজ্য করে মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেন। আবার অনেক সময় স্ব স্ব রাজনৈতিক দলকে ‘দলীয় অনুদান’ দেওয়ার ছদ্মাবরণে চাঁদাবাজি করে অর্থ জোগাড় করেন।

২. বাজারঘাট ইজারা এবং পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি : প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় হাটবাজার নিজের লোকদের ইজারা দিয়ে, বাসস্ট্যান্ড, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে চাঁদা আদায় করে অবৈধ অর্থ উপার্জন।

৩. মাদকের অর্থ : অনেক এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসা চলে এবং প্রার্থীরা সেখান থেকে নির্বাচনী অর্থ সংগ্রহ করেন।

৪. ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের বিনিয়োগ : স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ঠিকাদার এবং ভূমিখেকো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ‘উপযুক্ত প্রার্থী’-কে বিনিয়োগ করেন। একে বলা যায়, ‘ইলেকশন স্পন্সরশিপ’। তারা বিশ্বাস করেন, নির্বাচনে জয়ী হলে তারা তাদের ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবৈধ অর্থের দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে, মাঠে সক্রিয় প্রভাবশালী প্রার্থীরা অর্থ উপার্জন করছেন।

৫. বিদেশফেরত কালো টাকা : বিত্তশালী অনেক প্রবাসী তাদের নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বড় অঙ্কের অর্থের অনুদান দিচ্ছেন হীন স্বার্থসিদ্ধির প্রত্যাশায়। এমনকি, অনেক প্রবাসী রাজনৈতিক প্রার্থী দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন। এই টাকার উৎসের হিসাব অনেক সময় থাকে না এবং বিদেশে অর্জিত বৈধ বা অবৈধ অর্থ এখানে বিনিয়োগ হয়।

৬. পদ বাণিজ্য : নেতারা তাদের অধীনস্ত কর্মীদের বিভিন্ন পদের প্রত্যাশা দিয়ে অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করেন।

কারা এই দুর্নীতিবাজ প্রার্থীদের সহায়তা দেয়?: দুর্নীতিবাজ প্রার্থীরা সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে অদৃশ্য ও কৌশলী আঁতাতে থাকেন। তাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা চক্র এমন

১। ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার : প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং ঠিকাদাররা তাদের অবৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বা ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার আশায় এই সমস্ত দুর্নীতিবাজ প্রার্থীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে থাকে। ফলে তৈরি হয় ‘সম্পর্কভিত্তিক পুঁজিবাদ বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদ (Crony Capitalism), যেখানে ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভর করে রাজনৈতিক সংযোগ ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের ওপর এবং নির্বাচনের জন্য অর্থদাতারা পরবর্তী সময়ে নীতিগত সুবিধা লাভ করেন। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা (Francis Fukuyama), তার পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিকে গ্রন্থে এই প্রক্রিয়াটিকে ‘‘জনপ্রতিনিধির পদ কেবলমাত্র এক ধরনের ‘ক্রোনি’ চক্রের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের সোপান হয়ে দাঁড়ায়’’ বলে উল্লেখ করেছেন।

২। স্থানীয় প্রশাসন : অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনের আগে থেকেই সম্ভাব্য প্রভাবশালী প্রার্থীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন, তাদের নানা বৈধ বা অবৈধ সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশায়।

৩। দলীয় সিন্ডিকেট : দলীয় কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের একটি অংশ অনুগত বা বিত্তশালী প্রার্থীকে সমর্থন করে, কারণ তারা জানেন নির্বাচনের পর সে ব্যক্তি আর্থিক লেনদেন বা পদ-পদবির ভাগাভাগিতে সহানুভূতিশীল থাকবেন।

৪। প্রভাবশালী মিডিয়া ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর : নির্বাচনের আগে কিছু সংবাদমাধ্যম পক্ষপাতদুষ্ট কন্টেন্ট তৈরি করে এই সমস্ত দুর্নীতিবাজ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায়, এমনকি কিছু ইউটিউবার, ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নীতিহীন এই কাজের সঙ্গে জড়িত হয়।

৫. সন্ত্রাসী ও মাস্তান বাহিনী : ভোটের আগে এলাকায় ‘ভয়ভীতির রাজনীতি’ করতে অনেক প্রার্থী স্থানীয় মাস্তান বাহিনীর সাহায্য নেন। তারা টাকার বিনিময়ে তাদের সেবা দেয় যেমন : মিটিং-মিছিল, দখল, পোস্টার টানানো, প্রতিপক্ষকে হুমকি, এমনকি ভোটের দিন ব্যালট দখল।

বিশাল অঙ্কের ব্যয়ের ফলে একজন প্রার্থী যদি সংসদ সদস্য হয়ে ওঠেন, তার প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায় খরচের টাকা উঠিয়ে নেওয়া। সে কারণে দেখা যায়, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত একজন এমপির কাজ হয়ে দাঁড়ায় টেন্ডার সিন্ডিকেট চালানো, সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ, অবৈধ নিয়োগ-বাণিজ্য, কমিশনভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং দলীয় পদ বিক্রিসহ নানা অনিয়ম। এভাবে পাঁচ বছরে একজন এমপি তার বিনিয়োগের কয়েকগুণ মুনাফা আদায় করেন যাকেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় লুণ্ঠনমূলক শাসনব্যবস্থা বা কষবঢ়ঃড়পৎধপু। আসলে, এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সৎ ও মেধাবী প্রার্থীদের নির্বাচন অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ তারা এই দুর্নীতির পুঁজির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন না। তখন নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ‘জনসেবা’ হয়ে যায় ব্যবসা; জনগণ হয় প্রতারিত। কারণ অধিকাংশ প্রার্থী টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনেন। এরপর তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন না। যে কারণে রাজনীতিতে অপরাধীকরণ বাড়ে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজরা জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট হয় কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাষ্ট্রীয় তহবিলকে নিজের টাকা মনে করে। পরিশেষে, স্যুজান রোজ-আকারম্যান (ঝঁংধহ জড়ংব-অপশবৎসধহ) এর রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বের আলোকে বলতে হয় ‘যখন রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হয়, নির্বাচন হয় বিনিয়োগ, আর গণতন্ত্র হয়ে যায় লভ্যাংশের উৎস।’ সুতরাং, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে হলে আইন বা নির্বাচন কমিশনের নিয়মের পরিবর্তনসহ কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা যেখানে দলগুলো মনোনয়ন বাণিজ্যকে কঠোর হাতে প্রতিহত করবে, মনোনয়ন দেবে না দুর্নীতিবাজ  ও বিতর্কিত প্রার্থীদের। সর্বোপরি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে প্রয়োজন জনসচেতনতা, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে বা অবৈধ সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশায় একজন অযোগ্য দুর্নীতিবাজ নেতার পেছনে ঘুরবে না বা ভোট প্রদান করবে না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ইউনিভার্সিটি অব মালায়া

shahabuddin.suzan1@gmail.com