একটি সমাজে সুশাসন, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হয়। গত বছর দেশে যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, দেড় যুগের আওয়ামী লীগ শাসনের পতন হয়েছে, তার সূত্রপাত ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কার একটা পর্যায়ে রাখার। বাকিটুকু সম্পন্ন করবে নির্বাচিত সরকার। যদিও এর পরিসর অনেক ব্যাপক। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নীতিগত দিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিকসহ অনেক বিষয় রয়েছে, যেসব ক্ষেত্রে সংস্কারের ভীষণ দরকার। প্রশ্ন হচ্ছে, সেসব কি দলীয় সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে? কারণ, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একক নেতৃত্বের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। দলের সর্বোচ্চ নেতাই প্রায় সমস্ত সিদ্ধান্ত নেন। ফলে নিচের স্তরে, গ্রাম-উপজেলা পর্যায়ে নেতাকর্মীদের যৌক্তিক মতামত প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অনেকে বলছেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা। এর কারণ কী? যদিও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা বলেছেন ‘রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহে রিজার্ভের পালে হাওয়া লেগেছে। বৈদেশিক লেনদেন নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। সরকার প্রত্যাশার তুলনায় সফলতা অর্জন করতে পারেনি। বিনিয়োগ পরিস্থিতি নাজুক, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহে গতি আসেনি, গতানুগতিক ধারাবাহিকতায় দেওয়া হয়েছে বাজেট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে, সেগুলো পরবর্তী সরকারের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে কোনো সংস্কার স্থায়ী হবে না।’
সংলাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন ‘আর্থিক খাতে শুধু স্থিতিশীলতা এসেছে, রাজনৈতিক খাতে আসেনি। নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো অস্থিতিশীল। সবকিছু মিলিয়ে এখনই কেউ বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়বে এ প্রত্যাশা যদি কারও থাকে, আমি বলব সেটা কাল্পনিক। গভর্নর বলেন, ‘আমাকে বাস্তবসম্মত হতে হবে। বিনিয়োগ পাইপলাইনে আমরা দেখতে পারছি। কিন্তু আরেকটু সময় লাগবে। সামনে নির্বাচন, এই মুহূর্তে হয়তো বড় কোনো বিনিয়োগকারী আসতে চাইবেন না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আসতে চাইবেন না। কারণ পরবর্তী সরকার এগুলো চলমান রাখে কি না, সেটা সবাই দেখতে চাইবেন।’ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘গত ১৫ বছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভয়াবহ লুটপাট হয়েছে। অর্থ পাচারে গভর্নরদের দায় দিয়ে বলেন, ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে গেছে বেক্সিমকো। জনতা ব্যাংক থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। কোথাও শুনেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পালিয়ে যান?’ দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য জরুরি ভিত্তিতে জটিল নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আরও বলেছেন ‘চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিবর্তন টেকসই হয় না। গণতন্ত্র মানে অন্যের মতামত শোনা ও সম্মান করা। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে কাক্সিক্ষত সংস্কার সম্ভব নয়।’
এভাবে আমন্ত্রিত নেতারা চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। অনুষ্ঠানে শ্রমিক নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেছেন ‘আগের সরকারের সমালোচনা করলে বলা হতো স্বাধীনতাবিরোধী। আর এখন বলা হয়, ফ্যাসিবাদের দোসর। শুধু দোসর খোঁজেন, ভাশুরকে আড়াল করছেন কেন? একই পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে ভিন্ন ফলাফল আশা করেন কীভাবে?’ কিন্তু এই মুহূর্তে যা জরুরি, তা হচ্ছে প্রশাসন ও সার্বিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। সেটা কীভাবে সম্ভব সেটাই আসল প্রশ্ন। একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানের খোলনলচে পরিবর্তন করতে না পারলে, সরকারের সমস্ত গঠনমূলক সংস্কারের বাস্তবতা ঝাপসা হয়ে আসতে পারে। এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।