সম্প্রতি পালিত হলো আন্তর্জাতিক যুব দিবস। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১২ আগস্টকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, আর ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে তরুণদের সম্ভাবনা, শক্তি ও অধিকার তুলে ধরতে। বর্তমানে বিশ্বের তরুণ জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বাইরে স্থানীয় পর্যায়ের যুব উদ্যোগ’। ফলে তরুণরা কেবল জাতীয় বা বৈশ্বিক নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়েও কীভাবে সক্রিয় হয়ে টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের তরুণ: জনশক্তি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে প্রায় ৩৩% মানুষ ১৫–৩৫ বছর বয়সী তরুণ, যারা দেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ৬–৭% অবদান রাখছে। দেশের নোমিনাল জিডিপি প্রায় ৪৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাথাপিছু আয় প্রায় ২,৮২০ ডলার। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু আয় ৭৬,০০০ ডলার, জাপানে ৩৫,৩৯০ ডলার। ভারতের সঙ্গে আয় প্রায় সমান হলেও, সেখানে মুদ্রাস্ফীতি মাত্র ১.৫৫%, আর বাংলাদেশে তা প্রায় ৮.৫% সেটাও গত ২৪ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে সকলের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনমান চাপের মুখে পড়ে, তরুণরাও এই চাপের বাইরে নয়। শুধু তাই নয়—
•বেকারত্বের হার: বর্তমানে ৪.৬৩%, যা গত বছরের ৩.৯৫% থেকে বেড়েছে। যদিও ভারতে বেকারত্বের হার আরো বেশি।
•কর্মহীন মানুষের সংখ্যা: প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার, অধিকাংশই তরুণ।
•শিক্ষা-দক্ষতার ফাঁক: প্রতি বছর ২০–২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু কাজের সুযোগ সীমিত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্যমতে, প্রতি ১০ স্নাতকের মধ্যে ৭ জন দক্ষতার ঘাটতিতে বাজারের চাহিদা পূরণে অযোগ্য।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। হু বলছে, ১৫–২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে অন্তত ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যার পেছনে অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ ও একাকীত্ব বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রযুক্তি ও বৈষম্য
শহরের তরুণরা অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেবা ব্যবহার করে দক্ষতা বাড়াচ্ছে, কিন্তু গ্রামীণ তরুণরা এখনও ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সুযোগ থেকে অনেকটা বঞ্চিত। ডিজিটাল বৈষম্য কমানো ছাড়া টেকসই উন্নয়নে তরুণদের পূর্ণ অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তরুণদের বড় অংশ নেতৃত্ব তৈরির বদলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা ও দলাদলি তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশের পথে বাধা।
তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার কৌশল
১. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা: কোডিং, এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার সিকিউরিটি, গ্রিন টেকনোলজির মতো প্রয়োগমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব: বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও স্কিল ল্যাব চালু করা জরুরি।
২. স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তোলা: প্রতিটি বিভাগে “স্টার্টআপ ভিলেজ” প্রতিষ্ঠা, কর রেয়াত, সহজ ঋণ ও আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপের ব্যবস্থা।
৩. গিগ অর্থনীতি ও ফ্রিল্যান্সিং সম্প্রসারণ: বর্তমানে প্রায় ৬.৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে; ২০২৫ সালের মধ্যে তা ১০ লাখে উন্নীত করা।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ, ই-হেল্পলাইন ও অনলাইন সাপোর্ট সার্ভিস চালু।
৫. স্থানীয় উন্নয়নে যুব অংশগ্রহণ: উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যুব ফোরাম গঠন করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত করা।
বৈশ্বিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র
বাংলাদেশের তরুণরা নিম্নলিখিত খাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পারে:
ডিজিটাল অর্থনীতি: এআই, রোবোটিক্স, ব্লকচেইন, ডেটা সায়েন্স শিখে আন্তর্জাতিক আইটি সেবায় অংশগ্রহণ।
কৃষি আধুনিকায়ন: ড্রোন, আইওটি, স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো।
সবুজ প্রযুক্তি: নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে নেতৃত্ব নেওয়া।
রাষ্ট্রের করণীয়
জাতীয় যুব নীতি হালনাগাদ ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
ইয়ুথ এক্সেলেন্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা।
স্কিল-ল্যাব ও বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু।
হ্যাকাথন, ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ও স্টার্টআপ ফান্ড চালু।
একক জাতীয় যুব প্ল্যাটফর্ম গঠন করে নীতি প্রণয়নে তরুণদের অন্তর্ভুক্তি।
কেরালার স্টার্টআপ মডেল: অনুপ্রেরণা
ভারতের কেরালা রাজ্য সফলভাবে ‘স্টার্টআপ হাব’ গড়ে তুলেছে। কর রেয়াত, সহজ ঋণ, মেন্টরশিপ, প্রশিক্ষণ, ইনকিউবেটর, কো-ওয়ার্কিং স্পেস ও প্রযুক্তি পার্ক— সব মিলিয়ে তারা একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা পরিবেশ তৈরি করেছে। এই মডেল বাংলাদেশে প্রয়োগ করা গেলে প্রতিটি বিভাগের তরুণ উদ্যোক্তা সমান সুযোগ পাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
এসডিজি ও তরুণদের ভূমিকা
জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা—এসব ক্ষেত্রের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এগুলো অর্জনে তরুণদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরাসরি প্রভাবিত লক্ষ্যগুলো হলো—
•গুণগত শিক্ষা (এসডিজি-৪)– শিক্ষাকে প্রয়োগমুখী করা।
•লিঙ্গ সমতা (এসডিজি-৫)– নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।
•উপযুক্ত কর্মসংস্থান (এসডিজি-৮)– চাকরি সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়ানো।
•শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো (এসডিজি-৯)– নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রসার।
•জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা (এসডিজি-১৩)– সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ ও পরিবেশ রক্ষা।
তরুণদের যা করতে হবে
১. দক্ষতা অর্জন: এআই, ডেটা সায়েন্স, গ্রিন টেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল মার্কেটিং শেখা।
২. উদ্যোক্তা হওয়া: আইডিয়া বাস্তবায়ন ও সরকারি-বেসরকারি ফান্ড ব্যবহার।
৩. কমিউনিটি প্রজেক্টে অংশগ্রহণ: বৃক্ষরোপণ, নদী সংরক্ষণ, স্থানীয় শিক্ষা উন্নয়ন।
৪. অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ড: নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুযোগ বৃদ্ধি।
৫. আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা: যুব ফোরাম ও গ্লোবাল সামিটে অংশগ্রহণ।
তরুণদের হাতে আছে শুধু নিজের জীবনের নয়, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষমতা। ২০৩০ সালে যখন বিশ্ব বলবে—‘আমরা এসডিজি অর্জন করেছি’—তখন তার পেছনে থাকবে তরুণদের অবদান। চ্যালেঞ্জ যতই কঠিন হোক, যদি তরুণরা দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নৈতিক নেতৃত্বে অগ্রসর হন, তখন বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। তরুণদের জন্য আজকের প্রতিশ্রুতি হোক— আমরা সেই প্রজন্ম, যাকে দেখে আগামী বিশ্ব গর্ব করবে।
লেখক: ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক