শেষ না করেই প্রকল্পের সিংহভাগ টাকা ঠিকাদারের পকেটে

হবিগঞ্জের মাধবপুরে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৪) এর আওতায় নির্মাণাধীন ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। ছয় কোটি টাকার এ প্রকল্পে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে ঠিকাদাররা কাজ বন্ধ করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২১ সালে আটটি এবং ২০২২ সালে একটি বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হলেও ঠিকাদারদের দায়িত্বহীনতা ও কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকি না করার কারণে এসব কাজ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে, এলজিইডি এবং উপজেলা শিক্ষা অফিস পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে, ফলে প্রকৃত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পের আওতায় ৯টি বিদ্যালয়ের মোট বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে, অথচ বেশিরভাগ কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।

যেসব বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ চলছে সেগুলো হলো: শিমুলঘর, উত্তর খড়কি, আউলিয়াবাদ, রসুলপুর, খাটুরা, পুরাইখোলা, উত্তর বেজুড়া, সুরমা এবং চৌমুহনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও নতুন ভবন নির্মাণ।

এর মধ্যে চৌমুহনী সরকারি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। বাকি ৮টির কাজ আরও আগে, ২০২১ সালে শুরু হয়।

সর্বশেষ গত ১২ মার্চ উপজেলা শিক্ষা অফিসারের দপ্তর থেকে এসব প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিমুলঘর ও উত্তর খড়কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ শেষের হার ৬০-৭০%, অপরদিকে এলজিইডির দাবি ৮৫%। এ কাজে বরাদ্দের ১ কোটি ২১ লাখ টাকার মধ্যে ঠিকাদার তুলে নিয়েছেন ৯০ লাখ টাকা।

আউলিয়াবাদ ও রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, তবে এলজিইডির দাবি ৫ শতাংশ। এ প্রকল্পে ১ কোটি ২১ লাখের মধ্যে ঠিকাদার ৯০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন।

শিক্ষা অফিস বলছে, খাটুরা ও পুরাইখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজ শেষ হয়েছে ৫০-৬০%। তবে এলজিইডি বলছে, ৯৫ শতাংশ। ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার এ প্রকল্পে ঠিকাদার তুলেছেন ৯৪ লাখ টাকা।

এছাড়া উত্তর বেজুড়া ও সুরমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হওয়ার কথা শিক্ষা অফিসের প্রতিবেদনে উঠে এলেও এলজিইডি দাবি করছে ১০০%। এখানে বরাদ্দ ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার মধ্যে উত্তোলন হয়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ।

চৌমুহনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু ২০২২ সালে। বরাদ্দের ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার মধ্যে ৯২ লাখ টাকা তুলে নিলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ। এলজিইডির দাবি ৮২ শতাংশ কাজ করেছে ঠিকাদার।

শুধু বরাদ্দ নয়, পারফরম্যান্স গ্যারান্টির জামানতের ৫% টাকাও উত্তোলন করেছেন ঠিকাদাররা।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, এলজিইডি ও শিক্ষা অফিসের দাবির তুলনায় কাজের বাস্তব অগ্রগতি অনেক কম। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাজ শেষ হওয়ার আগেই এভাবে বিলের টাকা উত্তোলনের সঙ্গে এলজিইডির একটি চক্র জড়িত। এলজিইডির কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় এসব বিল উত্তোলন সম্ভব হয়েছে।

সদ্য বিদায়ী উপজেলা প্রকৌশলী রেজা উন নবীও এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন এ প্রতিনিধির কাছে। বর্তমানে নির্মাণকাজ একেবারেই বন্ধ থাকায় কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। কবে শেষ হবে কাজ কেউ বলতে পারছেন না।

শিক্ষা অফিসের প্রতিবেদনেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকার পরেও ঠিকাদারদের অধিক পরিমাণে বিল প্রদান করায় পরোক্ষভাবে এলজিইডিকে দায়ী করা হয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ট্রেডার্স ও মেসার্স গোলাম ফারুকের মালিক ঠিকাদার আবুল কালাম জানান, ‘কাজ তো শেষ করবই।’ এরপর ফোন তিনি কেটে দেন।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার এস এম জাকিরুল হাসান জানান, ‘আমি আমার জায়গা থেকে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এখন কীভাবে কী হবে না হবে কিছু বলতে পারছি না আর।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাহিদ বিন কাশেম জানান, ‘এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’