পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌরসভায় ৫৩ কোটি ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকার ব্যয়ে নির্মিত সুপেয় পানির প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারের ফলে মাত্র দুই বছরের মধ্যে অধিকাংশ পাইপ ফেটে (লিকেজ) গেছে, যার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ লিটার পানি অপচয় হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সংস্কারের জন্য আরও ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
২০১৬-১৭ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার এবং এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ‘উপকূলীয় শহর পরিবেশগত অবকাঠামো প্রকল্প’ (ইউজিআইআইপি)-এর আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। টিকিকাটা ইউনিয়নের সূর্যমনি গ্রামে ১০ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পে পাম্প হাউজ, গ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার, তিনটি বড় পুকুর, দৈনিক ৪৫ লাখ লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষম সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ৩৫০০ সার্ভিস কানেকশন, ১০০ এইচপি পাওয়ারের দুটি জেনারেটর, ৫ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার দুটি উঁচু জলাধার এবং প্রায় ৬ কিলোমিটার এমএস পাইপ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। গোপালগঞ্জের মিয়াপাড়ার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন হয়। ২০১৮ সালের মার্চে প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ চালু হয়। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল থেকে গ্রাহকদের পানি সরবরাহ শুরু হলেও দুই বছরের মধ্যে পাইপ লিকেজের সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে পৌরবাসী নিয়মিত পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রকল্পে নির্দেশিত ৩০ বছরের স্থায়িত্ব সম্পন্ন এমএস পাইপ ও ৯৯ বছরের পিপিআই পাইপের পরিবর্তে নিম্নমানের পাইপ এবং ফিটিংস ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস ছালেক এবং পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের বিরুদ্ধে। তবে তারা উভয়ই বদলি হয়ে বর্তমানে মুলাদী পৌরসভায় কর্মরত আছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ দুই কর্মকর্তা বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৪ শতক জমিতে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ নামে একটি আটতলা ফ্লাট নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া, প্রকল্পের নথিপত্র পৌর অফিসে সংরক্ষিত না থাকায় তদন্তে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান পৌর প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম গত ২৯ জুন সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস ছালেক, নকশাকার সেলিম মল্লিক এবং টিউবওয়েল মেকানিক বাবুল মাতুব্বরকে কারণ দর্শানো নোটিস জারি করেছেন। এরপর কিছু নথিপত্র উদ্ধার হলেও তা সম্পূর্ণ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রোমানা বলেন, ‘লাইনের পানি আমরা পাই না, কিন্তু প্রতি মাসে বিল দিতে হয়। পানির অভাবে আমাদের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।’ পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পাইপ লিকেজের কারণে প্রতিদিন ৮ লাখ লিটার পানি অপচয় হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার না হলে পৌরবাসী পানি সংকটে পড়বে।’
প্রকল্পের জন্য ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে দুটি পানির ট্যাংকের জন্য জমি অধিগ্রহণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম হাওলাদার জানান, তৎকালীন মেয়র রফিউদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস তার স্ত্রীর নামে থাকা ১৪ শতক জমি কম মূল্যে অধিগ্রহণ করেছেন, যার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিউদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস বলেন, ‘এটা চলমান প্রক্রিয়া। পাইপ খারাপ হবে আবার সারতে হবে।’ কনসালট্যান্ট কৃষ্ণপদ রায় দায় এড়িয়ে বলেন, ‘কাজের শেষ পর্যন্ত আমি ছিলাম না।’
চলতি বছর জুন মাসে পিরোজপুর জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। পৌর প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম বলেন, ‘পানি অপচয় ও লিকেজ সমস্যার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’