বারনামাকে ড. ইউনূস

রাজনীতিতে জড়ানোর বা নির্বাচন করার কোনো ইচ্ছা নেই

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, রাজনীতিতে জড়ানো বা আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। মালয়েশিয়া সফরে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বারনামাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি এমন একজন মানুষ, যার রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’ গতকাল শুক্রবার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দল গঠনের উদ্যোগ নিলেও পরে রাজনীতি থেকে সরে আসেন ড. ইউনূস। গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রনেতাদের অনুরোধে তিনি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ঘোষণাও তিনি দিয়েছেন।

বারনামার প্রধান সম্পাদকসহ তিনজন সাংবাদিকের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দেশকে পুনর্গঠনের তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের কথাই বলেন ড. ইউনূস। তিনি জানান, এখন তার প্রধান কাজ সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। আগস্টেই আমরা এক বছর পার করলাম। এ সময়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি।’

অনেক অগ্রগতির একটি হিসাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করার কথা বলেন তিনি। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন চলতি মাসের শেষের দিকে পাওয়া যাবে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তাতে করে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে।

সংবিধানসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে ঐকমত্যের ওপর জোর দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘কারণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিছু বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন। সংসদ এক কক্ষ নাকি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে, তা নিয়েই অনেক বিতর্ক আছে।’ বাংলাদেশ এখন সঠিক পথে চলছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত।’

শেখ হাসিনার আমলের তিনটি নির্বাচনে জালিয়াতি, ভোটারদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ পেরিয়ে অনেক বছর পরে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা দিচ্ছেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘অনেক বছর পর জনগণ একটা নির্বাচন পাবে। এর আগের অনেকগুলো নির্বাচন ছিল জাল। কেউ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। ভোটকেন্দ্রে কী হচ্ছে, সেটাও জনগণ জানত না।’

শেখ হাসিনার শাসনামলে যারা অস্বীকৃতি ও বঞ্চনার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেনি, সেই লাখ লাখ ভোটারের জন্য আগামী নির্বাচন খুব তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলেও মন্তব্য করেন ড. ইউনূস।

বিচার-সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে পুরনো সমস্যা ফিরবে : গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে বাংলাদেশে আবার পুরনো সমস্যাগুলো ফিরে আসবে। গত বুধবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে সিঙ্গাপুরভিত্তিক চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ) টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য, পরিষ্কার ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, সেগুলো অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচন যদি বৈধ না হয়, তাহলে এর কোনো অর্থ নেই। আমার কাজ হলো এমন একটি গ্রহণযোগ্য, পরিষ্কার ও আনন্দদায়ক নির্বাচন নিশ্চিত করা।’ প্রধান উপদেষ্টা

বলেন, ‘আমরা প্রায় আমাদের লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে গেছি। বহু বিষয় সংস্কার প্রয়োজন, কারণ যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল, তা দুর্নীতিগ্রস্ত, অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগে ভরা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আগস্টে শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান এবং তার অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু হয়েছে। হাসিনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। বাংলাদেশ তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করলেও দিল্লি সাড়া দেয়নি। ইউনূস বলেন, ‘হাসিনা যেন বাংলাদেশ অস্থিতিশীল করার সুযোগ না পান, সে বিষয়ে ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরা বলেছি, আপনারা তাকে রাখুন, আমাদের বিচার চলবে। কিন্তু তিনি যেন দেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো সুযোগ না পান। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ।’ তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ঢাকার অবস্থান কিছুটা বদলেছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত। মার্চে ইউনূস বেইজিং সফর করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে, ভারতের সঙ্গেও আমরা ভালো সম্পর্ক চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কখনো বলিনি, আমরা ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই না। নেপাল ও ভুটানকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে আনতে পারি। ভারতের সেভেন সিস্টার্স সাতটি রাজ্যও এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে থাকতে পারে। কারণ, আমরা বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে একই সুবিধা ভাগ করে নিতে পারি।’

বিপ্লবের পর নেতৃত্বে আসা ৮৫ বছর বয়সী ইউনূস জানান, প্রথমে তিনি দায়িত্ব নিতে চাননি। কিন্তু ছাত্রনেতাদের অনুরোধ এবং জনগণের ত্যাগ তাকে রাজি করায়। নির্বাচন শেষে তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন বলেও জানান। শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘বাংলাদেশ আর পথভ্রষ্ট হবে না। যুবসমাজ যেন ভোট দিয়ে তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ব্যালট বাক্সে তুলে ধরে। আমি চাই, একটি ভালো সরকার আসুক এবং তা গণতান্ত্রিক নীতিমালা মেনে চলুক।’