বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম পথিকৃত আইয়ুব বাচ্চু। তরুণ প্রজন্মের সংগীতপিপাসুদের কাছে এই রকস্টার ছিলেন যেন এক উন্মাদনার নাম। অকাল প্রয়াত এ তারকার ৬৩ তম জন্মদিন আজ। ১৯৬২ সালের আজকের দিনে (১৬ আগস্ট) চট্টগ্রাম শহরের এনায়েত বাজারে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। তার জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন।
জানা গেছে, অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের সদস্যরা, এলআরবি ব্যান্ডের সদস্যরা এবং তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সহকর্মীরা। ‘আইয়ুব বাচ্চু: সেলিব্রেটিং লাইফ, লিগেসি অ্যান্ড চলো বদলে যাই’ শীর্ষক এ আয়োজনে শিল্পীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবেন গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, সুরকার ফোয়াদ নাসের বাবু, সংগীতশিল্পী নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া, বাপ্পা মজুমদারসহ অনেকে। শুধু আলোচনা নয়, এখনকার প্রজন্মের শিল্পীরাও গেয়ে শোনাবেন আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী গান। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে তার অপ্রকাশিত কিছু গান প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।
৭০ দশকে স্কুলে থাকতে বাবার কাছ থেকে একটি গিটার উপহার পান আইয়ুব বাচ্চু । আর সে থেকেই তার গানের চর্চা শুরু। কিশোর বয়সে প্রেমে পড়েন পশ্চিমা সংগীতের। হয়তো স্বপ্ন দেখতেন জিমি হেন্ড্রিক্স হওয়ার। যাকে আইয়ুব বাচ্চুর টিশার্টে প্রায়ই দেখা যেত। এক দিন দেশের এক টিভি অনুষ্ঠানে আইয়ুব বাচ্চু প্রথম দেখলেন আজম খানের পারফরম্যান্স। তার সঙ্গে ঝাঁকড়া চুলে গিটার বাজাচ্ছিলেন দেশের কিংবদন্তি গিটারিস্ট নয়ন মুন্সি। তা মুগ্ধ হয়ে যান আইয়ুব বাচ্চু। তখন থেকে নেশা চড়ে যায়। তাই কলেজ জীবনে বন্ধুদের নিয়ে একটি ব্যান্ড গড়লেন। নাম দিলেন ‘গাল্ডেন বয়েজ’।
চট্টগ্রামে সেই সময়ে বেশ জনপ্রিয় ‘ফিলিংস’ ব্যান্ড। আইয়ুব বাচ্চুর ইচ্ছে ছিল সেই ব্যান্ডে যুক্ত হওয়ার। কুমার বিশ্বজিতের সঙ্গে যেহেতু আগেই পরিচয় ছিল তাই সেই ইচ্ছাটাও পূর্ণ হলো। এতে আইয়ুব বাচ্চু তার গিটারের অনুশীলন আরও ভালোভাবে করার সুযোগ পেয়ে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল মূলত এটাই। এটা ছিল ১৯৭৮ সালের কথা। এরপর ১৬ বছর বয়সে ‘ফিলিংস’ থেকে আইয়ুব বাচ্চু প্রথম গান রেকর্ড করেন। শিরোনাম ‘হারানো বিকালের গল্প’। গীতিকার ছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। ব্যান্ডটিতে তিন বছরের মতো ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। পরবর্তীতে যোগ দেন চট্টগ্রামের আরও একটি জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘সোলস’-এ।
১৯৮৬ সালে সোলসে থাকা অবস্থায় ‘রক্তগোলাপ’ নামের নিজের প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন আইয়ুব বাচ্চু। এই অ্যালবামের সুর ও সঙ্গীত ছিল তার নিজেরই। কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার হলো, অ্যালবামের কভারে সুর ও সঙ্গীতের জায়গায় তিনি তার ডাকনাম ‘রবিন’ ব্যবহার করেন এবং শিল্পীর স্থানে আইয়ুব বাচ্চু ব্যবহার করেন। ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করেন দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ময়না’। পেছনের ব্যর্থতাকে এবার ছাপিয়ে পান সফলতা। আইয়ুব বাচ্চুর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয় এই অ্যালবামটিকে।
১৯৯০ সালে সোলস’র সঙ্গে পথচলার ইতি টানেন আইয়ুব বাচ্চু। উদ্দেশ্য ছিল নিজের ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল জন্ম নিল ‘এলআরবি’। ১৯৯২ সালে ‘এলআরবি ১ ও ২’ ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ করে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতে ইতিহাস তৈরি করে এলআরবি। পরবর্তীতে ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে বাজারে আসে এলআরবির দ্বিতীয় ও তৃতীয় অ্যালবাম ‘সুখ’ ও ‘তবুও’।
১৯৯৫ সালে আইয়ুব বাচ্চু বের করেন তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। এটিকে সর্বকালের সেরা একক অ্যালবামের একটি বলে অবিহিত করা হয়। একই বছর এলআরবির চতুর্থ ব্যান্ড অ্যালবাম ‘ঘুমন্ত শহরে’ প্রকাশিত হয়। এভাবেই ব্যান্ড ও একক অ্যালবামের পাশাপাশি মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশ করে গানপিপাসুদের মনে স্থায়ী আসন করে নেন তিনি। আবার সিনেমায় গান গেয়েও দেশের আনাচে-কানাচে সব বয়সি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যান তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আইয়ুব বাচ্চু শুধু নিজেই মিউজিক করেননি। অন্যতম গিটার বাদকও বটে। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান এই কিংবদন্তি।