এলডিসি থেকে উত্তরণ

উদ্বেগে ব্যবসায়ীরা, নির্ভার সরকার

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। এলডিসি থেকে উত্তরণ যে কোন দেশের জন্য আন্তর্জাতিক আসরে সম্মান বয়ে আনে। কিন্তু এই উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে বলে দাবি করছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। সে কারণে এই মুহূর্তে তারা এলডিসি থেকে উত্তরণের পক্ষে নন।

ব্যবসায়ীরা অন্তত ৩ থেকে ৫ বছর উত্তরণ প্রক্রিয়া যাতে পেছানো হয়, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উত্থাপন করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা যে কোন পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।

মূলত জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি) বিভিন্ন দেশের ক্যাটেগরি নির্ধারণ করে। সংস্থাটি বিশ্বের দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত—এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত করা হয়। এসব দেশকে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাঠামোর অধীনে রপ্তানি বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়া হয়। যাতে দেশগুলো ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করতে পারে।

তবে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত উন্নয়ন সাধিত হলে কোন দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেয় ইউএনসিডিপি। এ ক্ষেত্রে তিনটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোন দেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়।

মানদণ্ডগুলো হচ্ছে—ন্যূনতম মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এবং মানবসম্পদ সূচক। এই ৩ মানদণ্ডেই বাংলাদেশ উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের আর স্বল্পোননত দেশের তালিকায় থাকার সুযোগ নেই বলে মনে করে জাতিসংঘ। বাংলাদশেও এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত।

কিন্তু উত্তরণের ফলে বেশকিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) হারাবে। তবে উন্নয়নশীল দেশের জন্য জিএসপি প্লাস সুবিধার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেটি পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত পরিপালন করতে হয়, তা অনুসরণ করা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য কঠিন। এছাড়া জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশ যে চাঁদা দেয় সেটির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে ও বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশিদের শিক্ষাবৃত্তির পরিমাণ হ্রাস পাবে। এছাড়া বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে, সেগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে। তা নানা হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। এসব কারণে অনেক দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ফের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার শঙ্কা থাকে। এমন নজিরও আছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে রপ্তানিতে কি ধরনের প্রভাব পড়বে সে বিষয়ে কয়েক বছর আগে একটি মূল্যায়ন করেছিলো পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। তাতে উল্লেখ করা হয় যে, অন্তত ৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগস্ত হবে। এর বাইরে অর্থনীতিতে আরও কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেশের অর্থনীতি সেই ধাক্কা সামলাতে প্রস্তুত নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। সে জন্য তারা চান উত্তরণ প্রক্রিয়া যেন কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ নীটওয়্যার ম্যানুফাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণ আত্মহত্যার শামিল। যেহেতু আগের সরকার অনেক ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে অগ্রসর হয়েছিলো, তাই সে বিষয়টি পর্যালোচনা করে নতুন সরকারের কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য সময় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ বছর উত্তরণ প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য ৫ বছর অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা যাতে অব্যাহত রাখা হয়, সে জন্য অনেক আগেই ডব্লিউটিওতে আবেদন করা হয়েছে। তবে সেটি অনুমোদন পায়নি। আগামী মার্চে ডব্লিউটিওর বাণিজ্য মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে ফের আলোচনা হবে। তবে সেখানে যদি বিষয়টি অনুমোদন না-ও পায়, তারপরও বাংলাদেশের রপ্তানি যাতে সুরক্ষিত থাকে যে জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যেসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তার মধে অন্যতম ওষুধ শিল্প। এই থাকের উন্নয়নের বিষয়ে এসটিএসে পৃথক অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তারাও চান যে, এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো হোক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিমুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা বর্তমানে বিদ্যমান নেই। এই প্রস্তুতির গ্রহণের জন্য অন্তত ৫ বছর এলডিসি উত্তরণ পেছানো উচিত।’

এদিকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ এখন আর পেছানোর কোন সুযোগ নেই বলে মনে করেন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির সদস্য ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস—এই ৩টি দেশের আর পেছনে ফিরে যাওয়া সুযোগ নেই। এলডিসি হিসেবে বিভিন্ন দেশের যে ফাইল থাকে সিডিপিতে, এই ৩টি দেশের ক্ষেত্রে তা এরই মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

কোন উপায়ে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সুযোগ আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রথমত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশ কি কারণে পেছাতে যায়, সে বিষয়ে যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করে বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে সিডিপি বরাবর চিঠি লিখতে হবে। তবে সেই চিঠির ওপর ভিত্তি করে এলডিসি উত্তরণ পেছানো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারে, তাহলে বিষয়টিকে তারা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তুলতে পারে। এই অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে যে পর্যায়ে আছে, এই পর্যায় থেকে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর কোন নজির অতীতে নেই।