ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার ‘সর্বোচ্চ দাবিগুলো’ থেকে একটিবারের জন্যও সরে আসেননি—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তার মূল লক্ষ্য ইউক্রেনকে রাশিয়ার সরাসরি প্রভাবাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে এক অনুগত, মস্কো-পন্থী সরকার ক্ষমতায় থাকবে। অনেকের মতে, এটি হবে একপ্রকার ‘কৃষ্ণ সাগরের তীরে বেলারুশ’।
রুশ কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ঘুরিয়ে বলেন, তারা ‘যুদ্ধের মূল কারণগুলো সমাধান’ করতে চায়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে মস্কো যে কিছুটা নমনীয় হতে পারে, এমন ইঙ্গিতও মিলছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইউক্রেন যদি দোনেৎস্ক অঞ্চলের অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ—যেটি এখনো রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যায়নি—ছেড়ে দিতে সম্মত হয়, তাহলে পুতিন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেন।
তবে এটি ইউক্রেনের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত। কারণ, এই অঞ্চলেই রয়েছে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা কিয়েভের দিকে রুশ অগ্রযাত্রাকে রুখে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে, সংবিধান অনুযায়ী দেশের কোনও ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ।
এদিকে, রাশিয়া এখন পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দক্ষতার সঙ্গে পাশ কাটিয়ে গেছে। উপরন্তু, রাশিয়া এমন একটি বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে, এই ‘অসুবিধাজনক যুদ্ধ’ শেষ করলেই যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের অবস্থান স্পষ্ট—তারা প্রথমে একটি যুদ্ধবিরতি চায়। দেশটির শহরগুলো প্রতিদিন রাতেই রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হচ্ছে। ফলে, সরকার বলছে—যখন প্রতিদিন মানুষ মরছে, তখন কোনো দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি নিয়ে বাস্তব আলোচনা সম্ভব নয়।
এই ‘আগে যুদ্ধবিরতি’ নীতি এতদিন ইউরোপীয় মিত্রদের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে এসেছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে একমত হয়ে বলছেন— আলোচনা যেন সরাসরি স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়।
ইউক্রেনের দৃষ্টিতে, আদর্শ শান্তিচুক্তি মানে হবে— রাশিয়া ২০১৪ সালের পর যেসব ভূখণ্ড দখল করে বা আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অবৈধভাবে নিজের অন্তর্ভুক্ত করেছে, তা ফেরত দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিমিয়া ও চারটি ওবলাস্ত: খেরসন, জাপোরিঝিয়া, দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক।
তবে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর বিপুল সামরিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের পক্ষে সামরিকভাবে বিজয় অর্জন এখন বাস্তবসম্মত নয়। ফলে, অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা—ইউক্রেনকে একপ্রকার চাপের মুখে পড়ে রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলো ছেড়ে দেওয়া এক তিক্ত শান্তিচুক্তিতে সম্মত হতে হতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্নে ইউক্রেনের লক্ষ্য স্পষ্ট—ন্যাটো সদস্যপদ। এটি ভবিষ্যতের রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা বলেই তারা মনে করে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, ন্যাটোতে ইউক্রেনের প্রবেশের সম্ভাবনা নেই। তার পরিবর্তে ইউক্রেনকে দেওয়া হবে একটি প্রতীকী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—যার শর্ত ও কাঠামো এখনো অনির্ধারিত।