ডনবাস: যেখানে আটকা রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি আলোচনা

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সাড়ে ৩ বছরের যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বিশ্বনেতারা তোড়জোড় চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই শান্তি আলোচনা শেষমেষ একটি কেন্দ্রবিন্দুতে এসে আটকে যায়, আর সেটি হচ্ছে পূর্ব ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ডনবাস। 

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়ার কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে অন্যতম ডনবাস। আলাস্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে আলোচিত বৈঠকের পর শান্তি আনার যে প্রস্তাব উঠে এসেছে, তা হলো মস্কোর কাছে ডনবাস হস্তান্তরে কিয়েভকে রাজি করানো।

ডনবাস এখন শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি হয়ে উঠেছে ইউক্রেন যুদ্ধের মূল প্রশ্ন। ভবিষ্যতে এটি কার অধীনে থাকবে—রাশিয়া, না ইউক্রেন?

সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে ইউক্রেনের রুশভাষী এই এলাকা বরাবরই পুতিনের দাবি ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তিনি ২০১৪ সাল থেকে এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন—প্রথমে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মাধ্যমে, পরে ২০২২ সালে সরাসরি হামলা ও দখলের মাধ্যমে।

মূলত, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক—এই দুটি অঞ্চলকে একত্রে বলা হয় ডনবাস। সোভিয়েত যুগে এটি ছিল একটি বিশাল শিল্পাঞ্চল, যেখানে ছিল কয়লার খনি এবং স্টিল কারখানা। কিন্তু অঞ্চলটি শুধু শিল্প নয়—এখানে রয়েছে উর্বর কৃষিজমি, গুরুত্বপূর্ণ নদী এবং আজভ সাগরের উপকূলরেখা, যা একে আরও কৌশলগত করে তোলে।

সিএনএন বলছে, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ইউক্রেনকে অস্থির করতে পুতিন এখান থেকেই তার কার্যক্রম শুরু করেন। রুশপন্থী মিলিশিয়া, যাদের অনেকেই ট্যাংকসহ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, পুরো ডনবাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক শহর দখল করে ফেলে। সে সময় ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ছিল প্রস্তুতিহীন ও মনোবলে দুর্বল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লুহানস্ক ইতোমধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। তবে দোনেৎস্কের প্রায় ৩০% অঞ্চল এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে ইউক্রেন তার সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে। এই এলাকাগুলোর জন্যই ইউক্রেন হারিয়েছে হাজার হাজার সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকের প্রাণ।

আলাস্কা বৈঠকের কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, শান্তির জন্য ‘ভূখণ্ড বিনিময়’ হতে পারে। ইউক্রেনীয়দের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর—কোন ভূখণ্ড বিনিময়? রাশিয়া কি তাদের নিজস্ব অংশ দেবে ইউক্রেনকে?

বাস্তবে, ট্রাম্প পুতিনের প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পুরো ডনবাস রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে চাচ্ছেন বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদ ইয়ারোস্লাভ হ্রিতসাক বলেন, ‘এটা ইউক্রেনের মাটি। এই অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে খনিশ্রমিকরা, ইউক্রেনীয় জাতীয় পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে জন্মেছেন অনেক রাজনীতিবিদ, কবি ও প্রতিবাদকারী। আর আজ, যেসব শরণার্থী এই অঞ্চল থেকে পালিয়ে গেছেন, তারা যদি এটি রাশিয়ার অংশ হয়ে যায় তবে আর কখনও ফিরে যেতে পারবেন না।’

এছাড়া এই ধরনের জমি হস্তান্তর করার কোনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ইউক্রেনে নেই। সংসদীয় অনুমোদন ও গণভোট ছাড়া এটি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন এমপি ইন্না সোভসুন।

‘প্রক্রিয়াটা আসলে কী হবে—সেটাই কেউ জানে না। প্রেসিডেন্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেই হবে? নাকি সরকার বা সংসদের অনুমোদন লাগবে? সংবিধান লেখার সময় কেউ এসব ভাবেনি,’ বলেন তিনি।

প্রায় আট বছর ধরে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনী ও রুশ-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই চলে। ইউক্রেনের তথ্য অনুযায়ী, এতে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

২০১৪ সালের পর থেকে কমপক্ষে ১৫ লাখ ইউক্রেনীয় ডনবাস ছেড়ে চলে গেছেন। অন্যদিকে, আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলে বসবাস করছেন। মস্কো ইতোমধ্যেই ডনবাসের বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে লক্ষাধিক রুশ পাসপোর্ট বিতরণ করেছে, যেন তাদের নাগরিকত্বের দোহাই দিয়ে ভবিষ্যতে অঞ্চলটি পুরোপুরি রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা যায়।