কোনো রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের জোরপূর্বক প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে, কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয় না। এমনকি সেই ব্যক্তির আশ্রয় প্রার্থনার সুযোগও নেই। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও মানবাধিকার আইন অনুযায়ী বিতর্কিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত। এবার বেছে বেছে ভারতীয় মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। ভারতের অন্তত দেড়শ নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইন করেছে বিএসএফ। দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার অংশ হিসেবে, দেশের ২০ কোটি মুসলিমকে নির্যাতন, হয়রানি এবং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে। যদিও বিজেপি সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এরই মধ্যে গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া ১২০ ভারতীয় নাগরিককে সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারা ভারতের আসাম, মুড়িগাও, গোলাঘাট, কামরূপ, থুবড়ি, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, হাবড়া, চব্বিশ পরগনা ও কলকাতার আধার কার্ডধারী বাসিন্দা। এসব ভারতীয়কে ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, অন্য দেশের নাগরিকদের পুশইনের নামে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই। দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এমন আচরণ মেনে নেবে না।
নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, পুশইনের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অফিশিয়ালভাবে জানানোর পরেও, তা ঠেকানো যাচ্ছে না। এটি থামানো না গেলে, ভারত আরও উৎসাহিত হয়ে ভারতীয় নাগরিকদের পুশইন করা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সংকট গভীর হবে। বিশেষ করে, অতীতে আসামের কথিত অবৈধ বাংলাদেশি নিয়ে ভারত সরকারের যে তৎপরতা লক্ষ করা গেছে, সেটি আবারও শুরু হতে পারে। এভাবে ভারতীয় মুসলিমদের পুশইন বন্ধে প্রয়োজনে কূটনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনা। এতেও কাজ না হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জাতিসংঘের দ্বারস্থ হতে হবে। এটি শিষ্টাচারবহির্ভূত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খন্দকার মো. মাহবুবুর রহমান (রাজনীতি ও আইসিটি) একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। জানাচ্ছেন ‘যেকোনো মূল্যে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা হবে। আমাদের সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনোভাবেই অন্য দেশের নাগরিককে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। যাচাই-বাছাই করে যাদের ভারতীয় কাগজপত্র রয়েছে, তাদের সীমান্ত থেকেই ফেরত দেওয়া হচ্ছে। ১২০ জনের নাম-পরিচয় প্রকাশ হলেও সংখ্যাটি আরও বেশি।’ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাহেদুর রহমান জানাচ্ছেন ‘বাংলাদেশ নিজস্ব সত্তার বিকাশ ঘটাতে চাচ্ছে, তাই ভারত নাখোশ হয়ে ভারতীয় বাংলাভাষীদের ঠেলে দিচ্ছে। এটি মূলত রাজনৈতিক কারণে।’
বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে সম্প্রতি গুজরাটে যেসব বাংলাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশি বলে দাবি করা হয়েছিল, তারা প্রায় সবাই ভারতীয় মুসলমান। কিছু সংখ্যক মানুষ আছেন, যাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশি। সেসব গুজরাটি মুসলমানকে পার্বত্য সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করছে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভারতের কর্তৃপক্ষ কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই দেশ থেকে শয়ে শয়ে বাংলাভাষী মুসলমানকে এই অভিযোগ করে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিচ্ছে যে, তারা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। যদিও প্রত্যেকেই ভারতীয় নাগরিক। এ রকম প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু তাতে কী? প্রশ্ন হচ্ছে, এইভাবে কি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে? যখন পররাষ্ট্রনীতির আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘিত হচ্ছে, পাশর্^বর্তী সীমান্ত লাগোয়া দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের কী করণীয় হতে পারে সেটাই বর্তমানে গুরুতর বিষয়। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং একটি অশুভ বার্তা দেয় যা কোনো দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।