শুরুর পর গত ২৭ বছরে সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৪ হাজার ৪২৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করেছে সরকার। এরমধ্যে ৬২টি ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট চালু থাকা ১৪ হাজার ৩৬৩ টি ক্লিনিকের মধ্যে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ৫ হাজার ৮০টি, যা মোট চালু থাকা ক্লিনিকের ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এসব ঝুঁকিপূর্ণ ক্লিনিক নতুন করে স্থানান্তর বা নির্মাণ করতে হবে।
আজ বুধবার ঢাকার মহাখালীর বিএমআরসি সম্মেলন কক্ষে ‘কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য জানান কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান।
সেমিনারে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের কাজ শুরু করা হবে। এরই মধ্যে একটি তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। তবে কবে নাগাদ এই ক্লিনিকগুলো স্থাপন করা হবে, তা এখনও নির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, শহর এলাকাতেও কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শহরে জমি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সেমিনারে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিকল্পনার সময় হিসাব ছিল প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য অথবা ৩০ মিনিট হাঁটার দূরত্বে একটি ক্লিনিক থাকবে। কিন্তু দেশের বাস্তবতায় সেটি সব জায়গায় সম্ভব হয়নি। পাহাড়ি এলাকা, হাওর কিংবা চর অঞ্চলের কোনো কোনো জায়গায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার মানুষের জন্য একটি ক্লিনিক রয়েছে। এখন অনেক ইউনিয়নে জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে সেখানকার কর্মীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই ঘাটতি পূরণেই নতুন করে কমিউনিটি ক্লিনিক বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ইতোমধ্যে ইডিসিএল থেকে ১২০ কোটি টাকার ওষুধ কেনা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব ওষুধ সব কমিউনিটি ক্লিনিকে পৌঁছে যাবে। আরও ২০০ কোটি টাকার ওষুধ দ্রুত কেনা হবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত ১৩ হাজার ৯৮৯ জনের বেতন ভাতাদি বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং অন্য ও সেবা বাবদ ২১৬ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ৬৭১ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ১৪ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। আশা করছি এ সমস্যা কেটে যাবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন মো. আখতারুজ্জামান। তিনি জানান, কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন জনস্বাস্থ্যসেবার জন্য আলাদা সুবিধা থাকা জরুরি। ৯২ শতাংশ নাগরিক চান স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সরকার বহন করুক। আর ৯৭ শতাংশ মানুষ চান এসব সেবা হোক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এসব চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে কমিউনিটি ক্লিনিক।
সেমিনারে কমিউনিটি ক্লিনিকের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন ট্রাস্টের পরিচালক (মাঠ প্রশাসন) ডা. আসিফ মাহমুদ। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক হতে দৈনিক গড়ে ৩৫ জন ও সারাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হচ্ছে। সে হিসেবে বছর প্রায় ১৬ কোটি মানুষ এই ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ১৬ ধরনের স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা এবং বিনামূল্যে ২২ ধরনের ঔষধ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জটিল বা গুরুতর রোগীদের নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।
ডা . আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ক্লিনিকগুলোর নিজস্ব ভবন নির্মাণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সিএইচসিপি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা আধুনিক প্রশিক্ষণ পাবেন।একইসঙ্গে সারাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চালু করা হবে ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম, যার মাধ্যমে একজন সেবাগ্রহীতা কোথায়, কী চিকিৎসা পেয়েছেন তা ট্র্যাক করা যাবে এবং সঠিক সময়ে সঠিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ধাপে ধাপে ৮০ শতাংশ বা তারও বেশি পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে (বর্তমানে ৫৪ শতাংশ)। তাদের ধাত্রীবিদ্যায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ক এসডিজি লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়। এছাড়া হাওর, চর, উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে প্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মানুষের জন্য একটি করে নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হবে।
কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিরোধমূলক ও পরামর্শমূলক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। এখানে সাধারণত বড় ধরনের ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক থাকে না। প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, এন্টাসিড ইত্যাদি সাধারণ ওষুধ দিয়েই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গর্ভবতী মায়েদের জন্য বিশেষ সেবা রয়েছে এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী সিএইচসিপিরা নিরাপদভাবে স্বাভাবিক ডেলিভারি করাতে সক্ষম।