ভুয়া মৃত্যুসনদ বানিয়ে জমি দখলের চেষ্টা, তদন্তের নির্দেশ আদালতের

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ৫০ বছর আগে দেশ ত্যাগ করা দিব্যেন্দু মজুমদার নামের এক ভারতীয় নাগরিকের নামে ভুয়া মৃত্যুসনদ তৈরি করে হাবিুবল হক মজুমদার গং এর বিরুদ্ধে অন্যের মালিকানা ও ভোগদখলীয় জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কাশিনগর ইউনিয়নের যাত্রাপুর গ্রামে। এ ঘটনায় আদালতে উভয়পক্ষের পাল্টাপাল্টি মামলা দায়েরের প্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গত বুধবার (২০ আগস্ট) বিষয়টির তদন্তে আসেন ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত টিম। তদন্তে দিব্যেন্দু মজুমদারের নামে ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রদত্ত মৃত্যু সনদটি জাল বলে প্রমাণিত হয়। মৃত্যু সনদে যে তারিখে দিব্যেন্দু মজুমদারের মৃত্যু দেখানো হয়েছে ওই তারিখে তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন না বলে এলাকাবাসী তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নিকট স্বাক্ষ্য দেন। দিব্যেন্দু মজুমদার স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সপরিবারে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে সেখানে বসবাস করছেন। দিব্যেন্দু মজুমদারের ভারতীয় নাগরিকত্বের বিভিন্ন প্রকার সনদ ও পর্যাপ্ত ডকুমেন্ট তদন্তকারীদের নিকট হস্তান্তর করেন এলাকাবাসী।

জনশ্রুতি রয়েছে, ২০২০ সালে তৎকালীন কাশিনগর ইউপি চেয়ারম্যান মো: মোশারেফ হোসেন, স্থানীয় আওয়ামীলীগ দলীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দিব্যেন্দু মজুমদারের নামে ভুয়া মৃত্যু সনদ ইস্যু করেন। ইউপি চেয়ারম্যান মো: মোশারেফ হোসেন ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) এর সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক রেলপথ মন্ত্রী মো: মুজিবুল হক এর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন বলেও জানা গেছে। সাবেক রেলমন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তার ক্ষমতার দাপটে কেউই তখন ভয়ে মুখ খুলতোনা। হেন কোনো অন্যায় নেই তিনি তখন করেননি। ক্ষমতার প্রভাবে তিনি সমগ্র ইউনিয়নবাসীকে জিম্মি করে রেখেছিলেন। গড়েছেন কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। বিদেশেও বাড়ী কিনেছেন বলে শোনা যাচ্ছে এখন। পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে তার ব্যাপারে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করতে শুরু করেছে ইউনিয়নবাসী। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, কাশিনগর ইউনিয়নের যাত্রাপুর মৌজাধীন বিভিন্ন দাগে বাংলাদেশে থাকাকালীন দিব্যেন্দু মজুমদারের পিতা শশি কুমার মজুমদারের অন্তত কয়েক একর জমি ছিল। শশি কুমার মজুমদার সপরিবারে বাংলাদেশ ত্যাগ করার সময় জমিগুলো স্থানীয় কয়েকজন মুসলিমকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হস্তান্তর করে চলে যান। পরে জমি গ্রহীতারা নিজেদের নামে বিএস খতিয়ান সম্পন্ন করেন এবং নিজ নিজ ভোগদখলে রয়েছেন। এরপর ২০০৯ সালে দিব্যেন্দু মজুমদার থেকে একটি দলিল সম্পাদনের নামে জমিগুলো নিজেদের বলে দাবি করেন স্থানীয় মৃত আকুব আলী মজুমদারেরর ছেলে হাবিবুল হক মজুমদার গং। এ ঘটনায় আদালতে একাধিক মামলা দায়ের হয়।

২০১৮ সালে আদালতের একটি রায়ে দিব্যেন্দু মজুমদার বাংলাদেশের নাগরিক নন বলে জানা গেছে। একই সাথে আদালত তার ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়টিও নিশ্চিত করেন। তিনি এখনও জীবিত আছেন এবং ভারতের কলকাতার শ্যামপুকুর এলাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। আদালতে ৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার মাধ্যমে দিব্যেন্দু মজুমদারের মা পারুল বালা মজুমদার বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করেন।

জানা গেছে, ভারতীয় নাগরিক দিব্যেন্দু মজুমদার প্রতারণার মাধ্যমে আদালতকে বিভ্রান্ত করায় তিনি এখন গ্রেপ্তারের ভয়ে আর বাংলাদেশে আসছেন না। এ ঘটনার জেরে যাত্রাপুর গ্রামের একটি কুচক্রিমহল দিব্যেন্দু মজুমদারের জমিগুলো নিজ দখলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পায়তারা শুরু করে। পরে ২০২০ সালে দিব্যেন্দু মজুমদার বাংলাদেশে বসবাসরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন মর্মে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রদত্ত একটি মৃত্যু সনদ প্রমাণ স্বরূপ আদালতে দাখিল করেন। আদালত বিষয়টির অধিকতর তদন্তের জন্য কাশিনগর ইউপির বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন।

এলাকার শতবর্তী কয়েকজন মুসলিম নাগরিকও বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দিব্যেন্দু মজুমদারের বাংলাদেশে মৃত্যুবরণের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই সপরিবারে এদেশ ত্যাগ করে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। শুনেছি তিনি সেখানে এখনও জীবিত আছেন।

এ বিষয়ে কাশিনগর ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশে দিব্যেন্দু মজুমদারের বাংলাদেশে মৃত্যুবরণের বিষয়টির ব্যাপারে তদন্তে আসি। এখানকার বয়োজ্যৈষ্ঠ মুরব্বি ও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে শিগগিরই আদালতে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।