জাতীয় নির্বাচন ঘোষণার পর প্রথম শুরু হয় সংস্কার-বিচার বাকি রেখে নির্বাচন হতে পারে না। বলা হয়, নির্বাচন হলে আগে হোক স্থানীয় সরকার নির্বাচন। একটি পক্ষ থেকে বলা হয় হতে হবে, গণপরিষদ নির্বাচন। যেখানে প্রণীত এবং গৃহীত হবে নতুন সংবিধান। এরও আগে দলছুট কতিপয় মোবাইল ফোনবাজ এবং পতিত শাসক দলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কতিপয় ব্যক্তি একযোগে ভিন্ন অবস্থান থেকে বলতে শুরু করে, গণভোটের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার চলুক চার-পাঁচ বছর। ২০০৭-এর ১/১১-তে উড়ে এসে জুড়ে বসা, মইন-ফখরের তত্ত্বাবধায়ক তকমাধারী সরকার ২০০৮-এর বানোয়াট নির্বাচনে যে ফলাফল ঘোষণা করে, তার সূত্র ধরে ক্ষমতা কবজাকারী প্রাচীন দলটি প্রথম মেয়াদেই শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ করে। কায়েম হয় কর্তৃত্ববাদ। সর্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোটব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত হয়। দিন মাস বছর পেরিয়ে এর প্রতিবাদে সংক্ষুব্ধ সমাজ ফুঁসে ওঠে এবং অবশেষে গত বছরের জুলাই মহাসংগ্রামের বিজয়। শূন্যতা পূরণে এখন যথাযথ নির্বাচন, গণতন্ত্র, বিচারালয়ের স্বতন্ত্র স্বাধীন অস্তিত্বের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সার্বভৌম সংসদ সংবলিত সাংবিধানিক রাষ্ট্রাচার কায়েমের বিষয় যখন জরুরি প্রয়োজন হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে, তখন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।
এই বাস্তব চাহিদা না মিটিয়ে, একে বিলম্বিত করতে শুরু হয়েছে ‘পিআর’ (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) বা সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্বের নতুন কূটচাল। অতীতের কিছু কথা এখানে স্মরণযোগ্য। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং দলীয় প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ওই পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এটাই ছিল স্বাভাবিক। তৎকালীন পাকি-প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবকে দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। কিন্তু তখনকার পশ্চিমি পাকি-নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো সংখ্যানুপাতিক হারের এক আজগুবি হিসাব দেখিয়ে বলেন, এ নির্বাচনের ফলাফল দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা স্থির করেছে। শুরু হয় তর্ক-বিতণ্ডা এবং শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র, ন্যায্যতা ও জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধ। অবশেষে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। পিআরের প্রসঙ্গ যারা তুলছেন, তাদের মধ্যে যারা পুরনো, তারা তাদের ৮০-৮৫ বছরের দলীয় অবস্থানে কখনো তা বলেননি। যারা নতুন, তারা বিশ^জনীন গণতন্ত্র ও ভোটের প্রথা হিসেবে পিআর কেন, কোথায় প্রয়োজন তার ভেদ বিচারে না গিয়েই তা বলছেন বলে অনুমান করি।
১৮১৯ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে একটি সমিতির নির্বাচনে এই প্রথার চর্চা হয় এবং সেই শেষ। ধারণাটা প্রথম আলোচনায় আসে যুক্তরাজ্যেই ১৭৮০ সালে। কিন্তু ব্রিটিশরা তাদের ভোটব্যবস্থায় ষোড়শ শতক থেকে এই চার-পাঁচশ বছর ধরে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ ব্যবস্থাই অনুসরণ করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় ১৯৪৪ সালে অনুল্লেখ্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবে এই প্রথার প্রচলন নিয়ে বিতর্ক করলেও, তা কখনোই স্বীকৃতি পায়নি ফেডারেল বা রাজ্যস্তরের কোথাও। স্ক্যান্ডিনেভীয় এবং পূর্ব ইউরোপের সীমিত জনসংখ্যার কয়েক দেশ ছাড়া জার্মানি-নেদারল্যান্ডস-নিউজিল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডে এ প্রথা চালু রয়েছে। আর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মতো গৌণ সংস্থায় চলছে, এ প্রথার এক জটিল সংস্করণ। এই প্রথাটি ব্যক্তি ভোটকে প্রাধান্য দিয়ে, রাষ্ট্রের নাগরিক একককে ক্ষমতায়িত করে না, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বরং গৌণ দলকে প্রতিনিধিত্বে স্থান দেয়। নাগরিকের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রের ক্ষমতার অদলবদলে বিশ^াসীজন কখনোই এমন পরোক্ষ ভোট ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতে পারে না। আর ভাষায়-জাতিত্বে সমসত্ত্ব বাংলাদেশের জন্য এ প্রথা, একেবারেই অবাস্তব চিন্তা।