নকীব খান বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অবিসংবাদিত এক নাম। দেশীয় ব্যান্ড সংগীতকে যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে এসেছেন, তাদের অন্যতম নকীব খান। বহুমাত্রিক এই প্রতিভা একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং নন্দিত ভোকাল। শুধু ব্যান্ড সংগীতই নয়, এ দেশের আধুনিক বাংলা গানের কিংবদন্তি সংগীত পরিচালকও বটে। কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী থেকে অনেক জনপ্রিয় শিল্পীদের অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে নকীব খানের সুরে। বরেণ্য এই তারকাকে ব্যান্ড সংগীতের অভিজাত ঘরানার শিল্পী বলে মন্তব্য করেন অনেকে। রক সংগীত জগতে তার নামটি উচ্চারিত হয় অনেকটা সম্ভ্রমের সহিত। তার ভক্ত-অনুরাগীরাও যেন অভিজাত রুচির।
গানের সঙ্গে তার সম্পর্ক এক দুবছরের নয়। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তিনি। নিজের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, আইয়ুব বাচ্চুর ‘এখন অনেক রাত’, নিজের ‘ভালো লাগে জ্যোৎস্না রাতে’, কুমার বিশ্বজিতের ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’সহ বেশ কিছু কালজয়ী গানের সুরকার তিনি। সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি নকীব খানের সংগীত জীবনের ৫০ বছর উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (টিজেএফবি)। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘নকীব খান ফিফটি ইয়ারস সেলিব্রেশন’। অনুষ্ঠানে নকীব খানের অর্ধশতক জুড়ে পথচলা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার সহকর্মী ও সমকালীন সংগীতশিল্পীরা।
বর্ণাঢ্য এ আয়োজনে সংগীতাঙ্গনের একঝাঁক তারকা শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তথ্য সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ, ইউল্যাব’র ভিসি প্রফেসর ইমরান রহমান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও টাইমস অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান, দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, খুরশিদ আলম, ফেরদৌস ওয়াহিদ, গীতিকার রফিকুজ্জামান, হানিফ সংকেত, নাসিম আলী খান, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, মাইলস ব্র্যান্ডের হামিন আহমেদ, ফুয়াদ নাসের বাবু, সংগীত পরিচালক মকসুদ জামিল মিন্টু, নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা, আনিসুর রহমান তনু, গীতিকার লিটন অধিকারী রিন্টু, শহীদ মোহাম্মদ জঙ্গী, পার্থ বড়ুয়া, সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী, মনির খান, আলম আরা মিনু, আঁখি আলমগীর, হুমাইরা বশির, অবসকিউরের টিপু, সংগীতশিল্পী ন্যান্সি, হাসান, মেজবাসহ অনেকেই। নকীব খানকে নিয়ে তাদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার গল্প বলেন তারা।
শুধু কথাই নয়, গানে গানে জমেছিল নকীব খানের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। সেখানে নকীব খান নিজেই গেয়ে শোনালেন তার জনপ্রিয় কিছু সৃষ্টি। পাশাপাশি তার গান পরিবেশন করেন হুমায়রা বশির, আঁখি আলমগীরসহ নতুন প্রজন্মের একঝাঁক কণ্ঠশিল্পী। এই আয়োজন নিয়ে টিজেএফবির সভাপতি রেদুয়ান খন্দকার বলেন, ‘নকীব খান আমাদের সংগীতজগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার ক্যারিয়ারের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করতে পেরে আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। আশা করছি গান আর গল্পে ভরপুর এই অনুষ্ঠানটি নকীব খানে এবং সংগীত পরিবারের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।'
নকীব খান বলেন, ‘৫০ বছর ধরে টিকে থাকা এবং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াটা অনেক বড় অর্জন। গান দিয়েই আমি সেই জায়গা পেয়েছি। আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।’
প্রথিতযশা সংগীশিল্পী নকীব ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কিশোর বয়সেই ব্যান্ডসংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। স্বাধীনতার পরপরই জন্মস্থান চট্টগ্রামে শুরু হয় নকীব খানের সংগীতের যাত্রা। বালার্ক ব্যান্ডের গায়ক, পিয়ানিস্ট ও শিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৪ সালে যোগ দেন সোলস-এ। সোলস ব্যান্ডে প্রায় ১০ বছর ছিলেন নকীব খান। বাবা মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড রেনেসাঁ। সেই থেকে রেনেসাঁ নিয়েই শ্রোতাদের ভালোবাসা কুড়িয়ে যাচ্ছেন নকীব খান।