কূটনৈতিক ফাঁদে পড়েছে দিল্লি?

কূটনীতির কার্যশৈলী অনেক সময় ভ্রমাত্মক হয়। ২০১৯ সালের হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ‘হাউডি মোদি’ সমাবেশ কিংবা পরের বছর আহমেদাবাদের ‘নমস্তে ট্রাম্প’ সমাবেশের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হতে পারে না। দুটো আয়োজনই সুচারুভাবে সাজানো হয়েছিল। যাতে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার আন্তরিক সম্পর্ক প্রদর্শিত হয়। যেন এটি ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আলোচিত থাকে। কিন্তু ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর ভারতের সঙ্গে অভাবনীয় দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে যেখানে বারবার অবজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে ভারতকে। কখনো শুল্ক আরোপ, প্রকাশ্য ভর্ৎসনা, আবার ধারাবাহিকভাবে কৌশলগত উপেক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা নানাভাবে এই অবনতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোদির নিরপেক্ষ অবস্থান ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছিল। আবার কেউ বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায়, ট্রাম্প ভারতকে শাস্তি দিচ্ছেন। কিন্তু এগুলো কেবল এক ধরনের ব্যাখ্যা মাত্র। আসলে ভারত, আমেরিকার অভিপ্রায় ও সক্ষমতাকে মৌলিকভাবে বুঝতে ভুল করেছে। ফলে দিল্লি আজ ভূ-রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কূটনৈতিকভাবে দিশাহীন। ভারতের এই ভুল  বোঝার প্রবণতা ইতিহাসে আরও রয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই আমেরিকান নেতারা, ভারতের গণতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশংসা করলেও অচিরেই তারা বিরক্ত হয়ে ওঠে ভারতের জোটনিরপেক্ষতা আর সোভিয়েত ঘনিষ্ঠতায়। শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকে আমেরিকা ভারতকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে। কিন্তু ভারতীয় কৌশলবিদরা যেটিকে ভারতের ‘মহাশক্তি’ মর্যাদার স্বীকৃতি মনে করেছিলেন, তা আসলে ছিল আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতকে আরও শক্তভাবে বাঁধার পরিকল্পনা।

দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ইতিহাসও এমন বৈষম্যই দেখায়। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়িয়ে আনে, ফলে ভারত পারমাণবিক প্রযুক্তি পায়। দিল্লি একে জ্বালানি ক্ষেত্রে বিপ্লব ভেবেছিল, কিন্তু আমেরিকার আসল প্রাপ্তি ছিল বাণিজ্যিক ভারতের পারমাণবিক খাতে মার্কিন কোম্পানির প্রবেশাধিকার। ভারতকে পুরনো প্রযুক্তির জন্য উচ্চমূল্য গুনতে হয়, আর সস্তা ও আধুনিক রুশ ও চীনা বিকল্পকে উপেক্ষা করতে হয়। ২০০৮ সালের বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিও, যা দিল্লি মহাকৌশলগত সাফল্য ভেবেছিল, আসলে তা ছিল আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থ। পরবর্তী প্রতিরক্ষা চুক্তি ২০১৬ সালের LEMOA (Logistics Exchange Memorandum of Agreement), ২০১৮ সালের COMCASA (Communications Compatibility and Security Agreement), এবং ২০২০ সালে ইঊঈঅ (BECA (Basic Exchange and Cooperation Agreement for Geospatial Intelligence)— ভারতের ধারণা ছিল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। বাস্তবে নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে। ২০১৭ সালের ডোকলাম সংঘাত আর ২০২০ সালের গালওয়ান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ প্রমাণ করে, আমেরিকার আশ্বাস চীনের আচরণ বদলাতে সামান্যই ভূমিকা রেখেছিল। ওয়াশিংটন এই চুক্তিগুলো ব্যবহার করেছে, ভারতকে কৌশলগত কাঠামোয় বেঁধে রাখতে, আর দিল্লি আঁকড়ে ধরেছিল সমতার ভ্রান্ত ধারণা। অর্থনৈতিক ভুলপাঠও ভারতের জন্য ব্যয়বহুল হয়েছে। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন, আমেরিকা-নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়ন স্থায়ী। অথচ তখনই এর ভিত কাঁপছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই শুল্ক ও সুরক্ষাবাদ শুরু হয়। বাইডেন ভাষায় নরম হলেও বাস্তবে তিনি উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্রদের প্রাধান্য দেন। ২০২৫ সালে ট্রাম্প ফেরার সময় বিশ্বায়ন থেকে সরে আসা পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু ভারত তখনো অপ্রস্তুত। ভাবছিল, চীনের মতো ১৯৯০-এর দশকে বাণিজ্যিক ছাড় পাবে। বাস্তবে ট্রাম্প ২০১৯ সালে ভারতের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে এবং ২০২৫ সালে ভারতীয় পণ্যে প্রথমে ২৫ শতাংশ, পরে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন রুশ তেল কেনার অজুহাতে। ফল হয়েছে ভয়াবহ। শুধু প্রযুক্তি খাত রপ্তানিতেই ক্ষতি ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে গেছে, প্রায় আধা শতাংশ পর্যন্ত। টেক্সটাইল ও চামড়ার ক্ষুদ্র শিল্প বিলুপ্তির পথে, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা হেরে যাচ্ছে। রুপি দুর্বল, শেয়ারবাজার টলমল, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের গর্বিত ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পর্ক সংকটে। দিল্লি ভুল পড়েছিল শুধু আমেরিকার অভিপ্রায় নয়, তার সক্ষমতাকে।

দীর্ঘদিন দিল্লি ভেবেছে, আমেরিকার চীনবিরোধী অবস্থান মানেই ভারতের নিঃশর্ত সমর্থন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ তার করুণ ফল। অথচ ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য কখনোই ভারতকে সমকক্ষ অংশীদার বানানো ছিল না। বরং স্বল্পমেয়াদে চীনের ভারসাম্য রক্ষায় ভারতকে ব্যবহার করা, আর দীর্ঘমেয়াদে ভারতের উত্থান ঠেকানো। যখন কোয়াড চীনের গতিপথ বদলাতে ব্যর্থ হলো, তখন আমেরিকার চাপ নেমে এলো ভারতের ওপরে রুশ তেল আমদানিতে সমালোচনা, শুল্ক আরোপ, আর মানবাধিকার প্রশ্নে আঙুল তোলা। এই ফাঁকে চীন সুযোগ নিয়েছে। ২০২৪ সালের সীমান্ত-উত্তেজনা প্রশমন চুক্তি সামরিক উত্তেজনা কমিয়েছে। ২০২৫ সালে পাঁচ বছর পর দুদেশের সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে, বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো খুলেছে, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ ফিরেছে। বিদ্রুপাত্মক সত্য হলো আমেরিকার চাপই ভারতকে ঠেলে দিয়েছে সেই শক্তির দিকে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল লক্ষ্য। ভারতের সামনে এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই তাকে সমকক্ষ অংশীদার ভাববে না আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি চলে স্বার্থে, আবেগে নয়। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ, রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়তে হবে। সবচেয়ে জরুরি, কৌশলগত প্রজ্ঞার প্রয়োগ শিখতে হবে সহযোগিতা করেও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা, যেমনটি চীন তার কূটনীতিতে করেছে। ইতিহাস সতর্কবার্তা দেয়। শীতল যুদ্ধকালে এবং পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তান নিজেকে আমেরিকার ‘অপরিহার্য মিত্র’ ভেবেছিল। উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে, ওয়াশিংটন তাকে পরিত্যাগ করে। ভারতও একই পরিণতির দিকে যাচ্ছে, যদি না

ভূ-রাজনীতির কঠিন সত্যটি বুঝতে পারে। ভারত আমেরিকার অভিপ্রায়কে সদয় ভেবেছে, আর সক্ষমতাকে সীমিত ভেবেছে। দুই ক্ষেত্রেই ভুল করেছে। স্বায়ত্তশাসন, ভারসাম্য আর কৌশলগত প্রজ্ঞা এগুলো ভারতকে পথ দেখাতে পারে। অন্যথায়, ওয়াশিংটনের চোখে ভারত থাকবে বর্তমান অবস্থাতে: কার্যকর, কিন্তু কখনো অপরিহার্য নয়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

writemah71@gmail.com