যুক্তরাজ্যে এতিম, অভিভাবকহীন এবং পরিবারে অনিরাপদ শিশুদের লালন-পালনের জন্য রাষ্ট্রীয় কেয়ার সিস্টেম রয়েছে। ব্রিটিশ মুসলিমরা সাধারণত তাদের আত্মীয়-স্বজনের এমন অসহায় শিশুদের রাষ্ট্রীয় কেয়ার সিস্টেমে পাঠায় না। এর ফলে যুক্তরাজ্য সরকার বছরে প্রায় ২২৩ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকুই প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ মুসলিমরা মূলত কয়েকটি কারণে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের শিশুদের দায়িত্ব নিচ্ছে এবং কেয়ার সিস্টেমে পাঠাচ্ছে না। তার অন্যতম হলো ধর্মীয় পরিবেশের অভাব। কেয়ার সিস্টেমে শিশুদের এমন পরিবেশে রাখা হয় যেখানে হালাল খাবার, ইসলামি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বজায় থাকে না। এতে শিশুর ধর্মীয় পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পরিবারগুলো চেষ্টা করে, শিশুটি যেন নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশেই বেড়ে উঠতে পারে।
আর ইসলাম পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধনকে খুব গুরুত্ব দেয়। মুসলিম পরিবারে আত্মীয়ের শিশুকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করা এক ধরনের দায়িত্ব ও সওয়াবের কাজ হিসেবে দেখা হয়। ফলে মুসলিম পরিবারগুলো এ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী থাকে এবং তারা আত্মীয়ের শিশু লালন-পালনে সাধারণ জনগণের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। ২০২১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে পাঁচ হাজার পাঁচশ মুসলিম শিশু আত্মীয়-স্বজনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা যায়, ব্রিটিশ মুসলমানদের প্রায় ৮০ শতাংশ মনে করেন, আত্মীয়ের শিশুদের যতœ নেওয়া তাদের দায়িত্ব। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের মধ্যে এ অনুপাত মাত্র ৪৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন অসহায় মুসলিম শিশুর যে সংখ্যা রয়েছে, সেটার অনেক কম অংশই কেয়ার সিস্টেমে আসে। গবেষকদের মতে, এটি মুসলিম সমাজের দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনের প্রতিফলন। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, এমন রাষ্ট্রীয় সেবায় ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, যা কাম্য নয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রফেসর জাভেদ খান ওবিই বলেন, ‘ধর্ম শিশুদের কাছে শুধু আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, এটি তাদের পরিচয় ও স্থিতির উৎস। কেয়ার সিস্টেমকে অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।’
কেয়ার সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসা তরুণদের অনেকেই নিজ সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাই প্রতিবেদনে তাদের জন্য ধর্ম সংবেদনশীল আবাসন, মেন্টরশিপ ও সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষকরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের পরিচয় নথিভুক্তকরণে ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করা, অভিভাবক নির্ধারণে ধর্মীয় উপাদান বিবেচনায় আনা, সমাজকর্মীদের ধর্মীয় সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ধর্মভিত্তিক দাতব্য সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার জন্য।
প্রফেসর খান বলেন, ‘এটি যুক্তরাজ্যের সেসব শিশুর বিষয়, যাদের পরিচয়ের অংশ হলো ধর্ম। ধর্মকে উপেক্ষা করা হলে শিশুরা অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি হারায় এবং কেয়ার সিস্টেমে অস্থিরতা বেড়ে যায়।’
কেয়ার সিস্টেমে শুধু ধর্মীয় পরিবেশের অভাবই নয়, বরং সাংস্কৃতিক অমিল, বৈষম্যের আশঙ্কা ও পরিচয় সংকটের মতো সমস্যাও বিদ্যমান। তাই মুসলিম পরিবারগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শিশুকে নিজের পরিবারের ভেতরেই রাখতে।