কারও পছন্দ লাল, কারও পছন্দ নীল, কারও আবার কমলা। ঝলমলে শত শত রঙে নিজেদের সাজাতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু এই রঙ বানাতে গিয়ে পৃথিবীর রক্ত চুষে নিচ্ছি না তো! এই কথা আমরা কেউ ভাবছি না। লালকে বানাচ্ছি বিষাক্ত কেমিক্যাল, নীলকে বানাচ্ছি নদীর অশ্রু, সবুজকে বানাচ্ছি বনভূমির দগ্ধ দেহ। আমাদের শিল্পের নামে প্রকৃতি প্রতিদিন নগ্ন হয়ে মরছে, আর আমরা তার রক্তাক্ত ছাইকে বলছি ‘ফ্যাশন’। শিল্প শুধুই নান্দনিকতার বাহন নয়, বরং হওয়ার কথা ছিল মানবজাতির ভবিষ্যৎকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার। তবেই তার ভেতর থেকে জন্ম নিতে পারবে নতুন এক বিপ্লব। আজকের বিশ্ব যেখানে পরিবেশ সংকট, জলবায়ু বিপর্যয় ও শিল্পদূষণের ঝড়ে জর্জরিত, তখন বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ‘ইকো প্রিন্টিং এক অনন্য শিল্পকৌশল এবং টেকসই ভবিষ্যতের আশা। এটি শুধু কাপড় বা কাগজে প্রাকৃতিক ছাপ তৈরির কৌশল নয়, বরং প্রকৃতি ও শিল্পের মেলবন্ধনে তৈরি এক নতুন সভ্যতার ভাষা। যা হবে নান্দনিক কিন্তু পরিবেশবান্ধব।
ইকো প্রিন্টিং মূলত একটি প্রাকৃতিক রঞ্জনকৌশল। এখানে গাছের পাতা, ফুল, বীজ, বাকল কিংবা শিকড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রঞ্জক সরাসরি কাপড়, কাগজ বা অন্য কোনো বস্ত্রের ভেতরে মুদ্রিত হয়। কোনো সিনথেটিক ডাই, কোনো বিষাক্ত কেমিক্যালের ব্যবহার ছাড়াই শুধু প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত গাছের বিভিন্ন অংশের প্রকৃত রঙ দ্বারা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু এই দ্বিতীয় খেতাব অর্জনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। গার্মেন্টস শিল্পের রঙিন বাহার আসলে নদীর জন্য মৃত্যুর কারণ এবং বাতাসের জন্য বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই বছরে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার দূষিত বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে। যার ফলে নদীতে বসবাসরত মাছের শ্বাসরোধ হয়, সাধারণ মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ফ্যাশনের নামে এই যে ধ্বংসযজ্ঞ, এটি কেবল একটি দেশ নয়, বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী শিল্প দূষণের প্রায় ২০ শতাংশ আসে কেবল টেক্সটাইল ডাইং ও ফিনিশিং শিল্প থেকে। এর বিপরীতে ইকো প্রিন্টিংয়ের ব্যাপক প্রচার প্রসার হয়ে উঠতে পারে এক নিঃশব্দ বিপ্লবের নাম। যেখানে নেই সিনথেটিক কেমিক্যাল, নেই বিষাক্ত বর্জ্য, নেই পানির অপচয়। এই পদ্ধতিতে স্থানীয় উদ্ভিদ থেকে রঙ তৈরি হয় বলে, রঙ আমদানিরও প্রয়োজন পড়ে না, ফলে কার্বন নির্গমনও কমে। ইকো প্রিন্টিংয়ে মূলত রঙের ঝলমলতা জন্ম নেয় পাতার সবুজ, ফুলের রস এবং বাকলের শ্বাসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাটি আরও বিস্ময়কর।
হাজার বছরের বয়নশিল্পের ইতিহাস, জামদানি থেকে নকশিকাঁথা, বাটিক থেকে হস্তশিল্পসহ সব শিল্পই গ্রাম-বাংলার মানুষের হাতে তৈরির অভূতপূর্ব ইতিহাস রয়েছে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ইকো প্রিন্টিংয়ের প্রাকৃতিক কৌশল, তবে বাংলাদেশের পরিচয় পাল্টে যেতে পারে বৈশ্বিক বাজারে। কড়ই, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, শিমুল, বেল কিংবা আম প্রতিটি গাছের পাতাই হতে পারে একেকটি রঙের ভাণ্ডার। ইকো প্রিন্টিংয়ের ছোঁয়া এবং সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যদি আমাদের দেশের গ্রাম-বাংলার মানুষেরা পোশাকে ফ্যাশনেবল ভ্যারিয়েন্ট এনে ফুটিয়ে তোলা যায় আমাদেরই মাঠে-ঘাটে জন্ম নেওয়া ফুল পাতার শিল্পকর্ম, আর তাতে যদি লেখা থাকে ‘Made in Bangladesh-Eco Friendly’ তবে এটি শুধু একটি পোশাক নয়, এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পরিচয়ের প্রতীক। ইকো প্রিন্টিং শুধু পরিবেশ রক্ষা করে এটাই নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও নতুন দরজা উন্মোচন করতে পারে। গ্রামীণ অল্প শিক্ষিত নারী-পুরুষ, যারা ঘরের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না এমন যেকোনো বয়সের মানুষেরা ঘরে বসেই কাজে অংশ নিতে পারেন। তাদের হাতে তৈরি হতে পারে, রপ্তানিযোগ্য পরিবেশবান্ধব পণ্য। সবচেয়ে আসার কথা হলো, ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রতিনিয়তই টেকসই ফ্যাশনের কদর বাড়ছে। তাই আমরা যদি ইকো প্রিন্টিংয়ের ধারণাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে বিশ^বাজারে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে এক বিশাল সম্ভাবনা।
শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও এটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ইকো প্রিন্টিং কর্মশালা, হস্তশিল্প প্রদর্শনী, প্রকৃতিনির্ভর ফ্যাশন শো এসবই বাংলাদেশকে এক নতুনভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পারে। ইকো প্রিন্টিং শুধু টেকসই অর্থনীতি নয়, এটি এক নান্দনিক দর্শনও বটে। এখানে প্রতিটি ছাপ একক ও পুনরাবৃত্তিহীন। এটি মানুষের মনে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জাগায়। এ থেকে প্রাপ্ত দর্শন একদিকে আমাদের শেখায় বিনয়, অন্যদিকে শিল্পকে করে তোলে মানবতার সঙ্গে প্রকৃতির সহযাত্রার প্রতীক। তা ছাড়া ইকো প্রিন্টিং একটি স্বাস্থ্যবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রক্রিয়া। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, নিমপাতার ছাপ অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল প্রভাব ফেলে, হলুদ ত্বকের জন্য নিরাপদ ও প্রদাহনাশক, পেয়ারা পাতার প্রিন্ট কাপড়ের স্থায়িত্ব বাড়ায়। অর্থাৎ এটি শুধু সৌন্দর্য বা নান্দনিকতার বিষয় নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তবে এর মানে এই নয়, ইকো প্রিন্টিংয়ের কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় না। অবশ্যই চ্যালেঞ্জ আছে। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ, অনেক সময় রঙ স্থায়ী হয় না এবং গবেষণা ছাড়া শিল্পায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। কিন্তু এসব অতিক্রমযোগ্য। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি ও বৈদেশিক প্রণোদনা ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে আমাদের সবার প্রচেষ্টায় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ইকো প্রিন্টিং একটি শিল্প নয়, একটি আন্দোলন এবং দর্শন। পৃথিবীর জন্য দিকনির্দেশনা। যেখানে শিল্প প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধিতা করবে না; বরং প্রকৃতির রঙে রঙিন হয়ে উঠবে। আর বাংলাদেশের মানুষ তাদের মনের শিল্প নৈপুণ্যতা মিশিয়ে প্রকৃতির দেওয়া শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, বিশ্ববাজারে ইকো প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে এক নতুন মাইলফলকের সূচনা করবে। এটি পুরো পৃথিবীর সামনে বাংলাদেশকে, পরিবেশবান্ধব শিল্প তৈরির জন্য পুরস্কৃত করতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
proggadas2005@gmail.com