বেসরকারি চাকরির পরিবেশ এবং মাতৃদুগ্ধ পান

একচেটিয়া স্তন্যপান বা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং (EBF) শিশু পুষ্টির জন্য স্বর্ণমান হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মেধার বিকাশ এবং শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে। বুকের দুধ খাওয়া শিশুর প্রথম মৌলিক অধিকার। একচেটিয়া স্তন্যপান বলতে বোঝায়, শিশুর জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ পান করানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ৬ মাস বয়স পর্যন্ত একচেটিয়া স্তন্যপান করানোর পরামর্শ দেয় এবং তারপর ২ বছর পর্যন্ত উপযুক্ত পরিপূরক খাবারসহ মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানো নবজাতকের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি সরবরাহ করে। এই সুবিধাগুলো সত্ত্বেও, বিশ্বব্যাপী, ০-৬ মাস বয়সী মাত্র ৪৪% শিশুকে একচেটিয়াভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS) ২০২২ অনুসারে, বাংলাদেশে যেসব শিশু তাদের জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ায় তাদের শতকরা হার ২০১৮ সালে ৬৫% থেকে কমে ২০২২ সালে ৫৫% হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোয় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে, তাদের ডায়রিয়া এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে,  যা অনুন্নত দেশগুলোতে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ।

আমাদের দেশে ঢাকা শহরসহ অন্যান্য শহর ও গ্রামাঞ্চলে পরিচালিত গুণগত গবেষণায় দেখা যায়, কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে সর্বোত্তম স্তন্যপান অনুশীলনের যথেষ্ট পর্যায়ে বাধা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে করপোরেট সেক্টরে কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে একচেটিয়া স্তন্যপান অনুশীলনকে লক্ষ্য করে বিস্তৃত গবেষণার সংখ্যা সীমিত রয়ে গেছে। ঢাকা শহরের করপোরেট সেক্টরে কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে স্তন্যপান অনুশীলনের প্রচলন পরীক্ষা করে এবং EBF অনুশীলনকে প্রভাবিত করে এমন সামাজিক-জনসংখ্যাগত এবং মাতৃত্বকালীন কারণগুলো চিহ্নিত করে নানা ব্যবধান পাওয়া যায়। বুকের দুধ খাওয়ালে ইন্দ্রিয়গত ও মেধার  বিকাশ বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী জীবনে শিশুরা সংক্রামক ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে রক্ষা পায়। একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করে এবং অসুস্থতার সময় দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। এটি মায়েদের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্তন্যদান মেয়েদের অনিয়মিত ঋতুস্রাবসহ নানা সমস্যার সমাধান করে। জীবনের প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ না খাওয়ানোতে, অনেক শিশুর শৈশবকালীন অসুস্থতা এবং মৃত্যুহার, দুর্বলতা, স্কুলে কর্মক্ষমতা হ্রাস, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়াসহ বুদ্ধি বিকাশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের ইচ্ছা স্বাভাবিক থাকলেও, কখনো পারিপার্শ্বিক সমস্যাগুলো সর্বোত্তম মাতৃদুগ্ধ পান করানোর ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং স্তন্যপান অস্থায়ী বা স্থায়ী বন্ধের দিকে পরিচালিত করতে পারে। এমন সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে এনগার্জমেন্ট, প্লাগডনালি এবং ম্যাস্টাইটিস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যদিও এনগার্জমেন্ট, প্লাগডনালি এবং ম্যাস্টাইটিস ও তাদের রোগজীবাণুতে বুকের দুধ আটকে থাকার সাধারণ সমস্যা জড়িত। কিছু মায়েরা প্রচলিত সমাধানের মাধ্যমে বুকের দুধ খাওয়ানোর সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে অক্ষম হতে পারেন।

EBF-এর নিম্ন হারের জন্য বিভিন্ন কারণ দায়ী। এটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, মায়ের বাড়ির বাইরে কাজ, মায়ের শিক্ষাগত স্তর, বাবার পেশা, মায়ের জ্ঞানের অভাব এবং ভুল তথ্য, প্রসব পদ্ধতি এবং অবস্থান, সেই সঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্য সমস্যা, সবই স্তন্যপান করানোর অনুশীলনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ন্ত্রণকারী আইন আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাবক উপাদান। গবেষণা থেকে জানা গেছে, মায়েদের চাকরিতে উপস্থিত থাকার কারণে স্তন্যপানের নিয়মিতকরণ বাধা হতে পারে। ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেশি অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন। বাংলাদেশে এই বিষয়ে কেন্দ্রীভূত গবেষণা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১১, ২০১৪ এবং ২০১৭-২০১৮ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS) থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে একটি গবেষণায় মাতৃত্বকালীন কর্মসংস্থান এবং একচেটিয়া স্তন্যপান অনুশীলনের মধ্যে প্রবণতা এবং সম্পর্কগুলো অন্বেষণ করা হয়েছে, কর্মজীবী মায়েদের একচেটিয়া স্তন্যপান অনুশীলন বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে জটিলতা এবং চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হয় তা তুলে ধরা হয়েছে।

কিছু পরামর্শ : সরকারি নীতিমালা তৈরি : করপোরেট প্রতিষ্ঠানে স্তন্যপান কার্যক্রমের জন্য নীতিমালা তৈরি করা উচিত, যার মাধ্যমে নারীদের জন্য সুবিধাজনক সময় ও স্পেস প্রদান করা হবে। মায়ের জন্য স্তন্যপান ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র : কর্মস্থলে স্তন্যপান করার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে মায়েরা নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে স্তন্যপান করাতে পারেন। মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি : মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং এটি কার্যকর হতে হবে, যেন নারীরা সন্তানের প্রতি যত্ন নিতে পারেন ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি : কর্মক্ষেত্রে স্তন্যপান বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা, যাতে নারীরা তাদের অধিকারের বিষয়ে অবগত হন এবং কর্মসংস্থানের পরিবেশে সমতা প্রতিষ্ঠা হয়। করপোরেট চাকরিতে নারীর স্তন্যপানের সুযোগ বৃদ্ধি করা কেবল নারীদের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক নীতিমালা ও সুবিধা প্রদান করলে নারীদের কর্মশক্তি ও কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক শিশু মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

ishahed86@gmail.com