সূর্য ডুবলে অন্ধকারে ৬০ হাজার মানুষ

প্রযুক্তির উন্নতি অব্যাহত, বিশ্ব এগিয়ে চলেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশাল পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও রাজশাহীর গোদাগাড়ীর আষাড়িয়াদহের মানুষ এখনো ‘অন্ধকার যুগে’ বাস করছে। দেশের দুর্গম এলাকাসহ অধিকাংশ স্থানে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেলেও আষাড়িয়াদহের বাসিন্দারা এখনো কেরোসিনের প্রদীপের আলোয় জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিনরাত কাটাচ্ছেন তারা। একটি বেসরকারি সংস্থা সোলার প্যানেলের মাধ্যমে দিনে মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এ সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মোবাইল চার্জের জন্য এই বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হয়।

গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন। পদ্মা নদী পার হয়ে এই চরে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বাস করে। এ যেন দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘন অন্ধকার নেমে আসে। বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের আলোতেই প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে হয়। সূর্যাস্ত থেকে পরদিন সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়টা যেন শুধু ঘুমের জন্য।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম জানান, তিনি কঠিন পরিশ্রম করে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে অনার্সের ছাত্র। এখানকার ছেলেমেয়েরা চরম কষ্টে দিনরাত কাটায়। পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। গরমে সব বয়সের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

আলিম বলেন, ‘পদ্মা নদীর তীরবর্তী পিরিজপুর থেকে চর আষাড়িয়াদহের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। পিরিজপুরে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সব সুবিধা থাকলেও নদীর ওপারে অবস্থিত এই ইউনিয়নে চিত্র একেবারে বিপরীত। বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে চরবাসী সবদিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে। আধুনিক সমাজের স্পর্শও এখানে পৌঁছায়নি।

২০১৫ সালে সরকারের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) কারিগরি সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা আভা এ ইউনিয়নে সৌর বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করে। আভা মিনি গ্রিড প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ৩০০ পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগ পায়। কিন্তু এতেও চরবাসীর ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। স্বাভাবিক বিদ্যুতের চেয়ে দ্বিগুণ মূল্য দিয়েও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ মেলেনি। লোকসানের কারণে গত জুনের মাঝামাঝি এ প্রকল্প গুটিয়ে নেয় কর্র্তৃপক্ষ। এখন শুধু নামাজের সময় কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, মেঘলা আকাশে তাও মেলে না।

চরের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমাম হোসেন বলেন, ‘আগের আভা মিনি গ্রিড প্রকল্পেও চরের মানুষ তেমন সুবিধা পায়নি। গ্রামে ১০০টি বাড়ি থাকলে হয়তো ২০টি বাড়ি বিদ্যুৎ পেত। তাও সারাদিন নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়া যেত না। চরে ৭ থেকে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও ওই প্রকল্পে মাত্র ৬০ কিলোওয়াট সরবরাহ হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নেসকোর কাছে বিভিন্নভাবে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছি।’

চর আষাড়িয়াদহের দিয়ার মানিকচর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহিল কাফি রাজশাহীতে ইলেকট্রনিকস পণ্য বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘চরে কখনোই পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ সুবিধা ছিল না। সোলার প্ল্যান্টের মাধ্যমে ইউনিয়নের একটি অংশে সীমিত সময়ের জন্য কম ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সরবরাহ হতো। আমরা যেকোনো মূল্যে চরে বিদ্যুৎ সংযোগ চাই।’

স্থানীয়রা জানান, ২০১৫ সালে আভার সোলার প্যানেলের মাধ্যমে চরের কিছু বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। এটুকু পেয়েই পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো যেন আধুনিকতার স্পর্শ পেয়েছিল। কিন্তু গত বছরের শেষে এই প্রকল্পের সক্ষমতা কমে যায়। এখন দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ মেলে।

ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এ জনপদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের কাছ থেকে শুধু আশ্বাস ছাড়া কিছুই পায়নি।

নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মিজানুর রহমান জানান, চরে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে এখনো তেমন অগ্রগতি হয়নি। বোর্ডে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এটুকুই অগ্রগতি। বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধাজনক উপায় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কবে নাগাদ চরের মানুষ সুখবর পাবে, সে বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর কোনো ধারণা নেই।